বিরোধীরা অনেকেই সঞ্চার সাথী অ্যাপটিকে কুখ্যাত পেগাসাস স্পাইওয়্যারের সঙ্গে তুলনা করছেন। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেই তুলনা অতিরঞ্জিত, কিন্তু সঞ্চার সাথী ফোন থেকে ‘ডিলিট বা ডিসেবল করা যাবে না’— কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তই ভাবাচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 2 December 2025 11:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোদী জমানায় (Modi Govt) এর আগেও ফোনে আড়িপাতা কাণ্ড নিয়ে অভিযোগের ঝড় উঠেছে। সেই সময়ে অভিযোগ ছিল, পেগাসাস (Pegasus) স্পাইওয়ারের মাধ্যমে রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) থেকে শুরু করে প্রশান্ত কিশোরের (Prashant Kishor) ফোনে আড়ি পাতছে সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছিলেন, ‘পেগাসাস ডেঞ্জারাস ফেরোসাস!’ জাতীয় রাজনীতিতে সেই পর্ব যেন ফের ফিরে এসেছে নয়া সঞ্চার সাথী (Sanchar Sathi Contoversy) অ্যাপকে কেন্দ্র করে।
সোমবার মোদী সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, সব স্মার্টফোনে বাধ্যতামূলকভাবে প্রি-ইনস্টলড থাকবে এই অ্যাপ। তা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন বিরোধীরা। সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে এ ব্যাপারে সংসদের ভিতরে ও বাইরে জোরদার বিরোধিতা করতে পারে তৃণমূলও।
বিরোধীরা অনেকেই সঞ্চার সাথী অ্যাপটিকে কুখ্যাত পেগাসাস স্পাইওয়্যারের (Pegasus) সঙ্গে তুলনা করছেন। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেই তুলনা অতিরঞ্জিত, কিন্তু সঞ্চার সাথী ফোন থেকে ‘ডিলিট বা ডিসেবল করা যাবে না’— কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তই ভাবাচ্ছে। সমাজমাধ্যমেও অনেকেই এর সমালোচনায় নেমে পড়েছেন। রমেশ শ্রীবৎস লিখেছেন, “সঞ্চার সাথী নিয়ে আমার আপত্তিটা গোপনীয়তা নয়। নিরাপত্তা’র অজুহাতে এটা সরাসরি অনুপ্রবেশ”। তাঁর কথায়, “আমি চাই সরকার আমার বাড়ির নিরাপত্তা দিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সরকার আমার ঘরের ভেতর একজন পুলিশ বসিয়ে দেবে”।
কেন্দ্রের নির্দেশ: নতুন-পুরনো সব ফোনেই অ্যাপ বাধ্যতামূলক (Sanchar Sathi Mandatory)
কেন্দ্র জানিয়েছে, নাগরিকদের চুরি যাওয়া ফোন কিনে ফেলার ঝুঁকি কমাতে সঞ্চার সাথীকে (Sanchar Sathi) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন ফোনে অ্যাপ প্রি-ইনস্টল থাকতে হবে। বাজারে থাকা ফোনগুলিতেও সফটওয়্যার আপডেটের (Software Update) মাধ্যমে অ্যাপ ঢোকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যবহারকারী কোনওভাবেই অ্যাপটি ডিলিট, ডিসেবল বা পরিবর্তন করতে পারবেন না।
রাজনৈতিক মহলে ঝড়: পেগাসাস প্লাস প্লাস (Pegasus++, Big Boss Surveillance)
কংগ্রেস সাংসদ কার্তি চিদাম্বরম লিখেছেন, “এটা পেগাসাস প্লাস প্লাস (Pegasus++)। সরকারের হাতে চলে যাবে আমাদের ফোন, আর আমাদের ব্যক্তিগত জীবন।” রাজ্যসভা সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীর টিপ্পনী কেটে বলেছেন, “এটা সরাসরি বিগ বস (Big Boss) স্টাইলে নজরদারি।” সিপিএম সাংসদ জন ব্রিট্টাস কটাক্ষ করেছেন— “এবার কি পায়ের গোড়ালিতে মনিটর লাগানো হবে? নাকি ১৪০ কোটি মানুষের ব্রেন-চিপ?” রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেহসিন পুনাওয়ালার মত, “এটি গোপনীয়তার উপর সরাসরি আঘাত। ফোন, মেসেজ, লোকেশন—সব নজরদারির আওতায় যেতে পারে।”*
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, পেগাসাস ও সঞ্চার সাথীকে এক সারিতে রাখা ঠিক নয়। পেগাসাস হল, নজরদারির উদ্দেশ্যে তৈরি বিশেষ স্পাইওয়্যার, যা টার্গেটেড ফোনের প্রায় সব তথ্য রেকর্ড করতে পারে। আর সঞ্চার সাথী হল, মূলত ফোন-ট্র্যাকিং ও নকল ডিভাইস শনাক্ত করার অ্যাপ।
তবে উদ্বেগের জায়গাটি অন্যত্র - অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল হলে এটি ক্যামেরা অ্যাক্সেস, কল ও মেসেজ মনিটরিং, নেটওয়ার্ক স্টেট পড়া, লোকেশন অ্যাক্সেস—অত্যন্ত সংবেদনশীল অনুমতি চাইবে। ‘ফোন ফাইন্ডার’ হিসেবে কাজ করতে এগুলো প্রয়োজন হতে পারে, তবে একইসঙ্গে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার জন্যও বড় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
উদ্বেগের প্রধান ৫টি কারণ (Sanchar Sathi 5 main concern)
১. ‘নজরদারি অ্যাপ’ হয়ে ওঠার ভয় বাড়ছে
সরকার বলছে সঞ্চার সাথী মূলত চুরি যাওয়া বা ভুয়ো ফোন শনাক্ত করার কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যবহারকারী কোনওভাবেই এটি মুছতে পারবেন না—এই বিধানই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কোনও অ্যাপকে অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ঢুকতে দিলে সেটি ভবিষ্যতে যে সর্বক্ষণিক লোকেশন ট্র্যাকার বা আরও বিস্তৃত নজরদারি টুলে পরিণত হবে না—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে—আজ IMEI ট্র্যাকিং, কাল কি ডিজিটাল আইডি বা VPN নিষিদ্ধের মতো নতুন ক্ষমতা যুক্ত হবে?
২. ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
মোবাইল ফোন আইনত ব্যক্তিগত সম্পত্তি - যেখানে থাকে বার্তা, নথি, ছবি, কাজের তথ্যসহ অজস্র সংবেদনশীল ডেটা। সমালোচকদের যুক্তি, একবার কোনও অ্যাপকে এমন সার্বক্ষণিক অধিকার দিলে এনক্রিপ্ট না-করা ডেটা বা ফোনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সরকারের নজরে পড়বে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়? ভবিষ্যতের কোনও আপডেটে অ্যাপের ক্ষমতা বাড়ানো হবে না—সেটাই বা কে বলবে? এই কারণেই অনেকেই বলছেন, এটি সরাসরি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে সরকারের দায়বদ্ধতার ঘাটতি
নতুন ডেটা প্রোটেকশন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কঠোর নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বহু ছাড় রয়েছে। ফলে ডেটা অপব্যবহার হলে নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার রাস্তা সীমিত। বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপের নির্দেশ সেই ফাঁকটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এটাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি অনুমোদনে
স্মার্টফোনে বাণিজ্যিক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ আগে থেকেই প্রি-ইনস্টল থাকা নতুন কিছু নয়। তবে এবার সরকার নিজেই এমন একটি অ্যাপ চাপিয়ে দিচ্ছে—যা মুছতেও দেওয়া হবে না। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের বক্তব্য, এতে ফোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাত থেকে আরও সরে যাবে।
৫. কোনও জনমত, কোনও খসড়া—কিছুই প্রকাশ না করেই সিদ্ধান্ত
টেলিকম দফতরের নীতি–প্রণয়নের স্বচ্ছতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। সঞ্চার সাথীকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তেও জনপরামর্শ নেওয়া হয়নি, প্রকাশ করা হয়নি কোনও খসড়াও। হঠাৎই সরাসরি নির্দেশ জারি হয়েছে। বিরোধী মহল ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ—এটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একতরফা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত।