কেন্দ্রের নির্দেশে ফোন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে অ্যাপটি প্রি-ইনস্টল করার কথা জানানো হয়েছিল। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় আশঙ্কা ছড়ায়।

জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া
শেষ আপডেট: 2 December 2025 17:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সঞ্চার সাথী (Sanchar Saathi App) অ্যাপ নিয়ে গোপন নজরদারি ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মাঝে স্পষ্ট বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় টেলিকম মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া(Jyotiraditya Scindia)। মঙ্গলবার তিনি জানিয়ে দিলেন, ফোনে সঞ্চার সাথী চালু করা একেবারেই বাধ্যতামূলক নয়। চাইলে ব্যবহারকারী অ্যাপটি ইনস্টল করবেন, না চাইলে ডিলিটও করে দিতে পারেন।
কেন্দ্রের নির্দেশে ফোন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে অ্যাপটি প্রি-ইনস্টল করার কথা জানানো হয়েছিল। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় আশঙ্কা ছড়ায়। যে সমস্ত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার অন্যতম হল, এই অ্যাপের মাধ্যমে কি তবে ব্যবহারকারীর কল, মেসেজ বা লোকেশন নজরে রাখবে সরকার?
এই বিতর্কেই সরাসরি উত্তর দিলেন সিন্ধিয়া। তাঁর কথায়, “আপনি চাইলে এটিকে অ্যাক্টিভেট করতে পারেন। না চাইলে করবেন না। আর কেউ না চাইলে অ্যাপটি ডিলিটও করে দিতে পারেন। সম্পূর্ণটাই ঐচ্ছিক।”
তিনি আরও জানান, সঞ্চার সাথীকে বাধ্যতামূলক করার কোনও সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা নেই সরকারের। এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের হাতে সাইবার প্রতারণা রুখতে একটি নিরাপদ টুল পৌঁছে দেওয়া।
টেলিকম মন্ত্রক আগেই জানিয়েছিল, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর কল বা ব্যক্তিগত তথ্য নজরদারি করে না। বরং মোবাইল চুরি, সিম জালিয়াতি বা আর্থিক প্রতারণা (Cyber Crime) আটকাতে এটি একটি সরকারি সাইবার-সুরক্ষা উদ্যোগ (Cyber Security)।
সিন্ধিয়ার ব্যাখ্যায় স্পষ্ট—সঞ্চার সাথী থাকুক বা না থাকুক, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ব্যবহারকারীর উপর। সরকার কোনও নজরদারির পথে হাঁটছে না, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতারণা রোধেই জোর দিচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই সঞ্চার সাথী অ্যাপ ফিরিয়ে এনেছে পেগাসাস (Pegasus) বিতর্কের স্মৃতি। সে সময়ে জাতীয় রাজনীতি কার্যত উত্তাল হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য হাতাতেই এই অ্যাপের ব্যবহার। সঞ্চার সাথী - এই অ্যাপ নিয়েও সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
দেখে নেওয়া যাক অ্যাপ নিয়ে উদ্বেগের প্রধান ৫টি কারণ -
১. ‘নজরদারি অ্যাপ’ হয়ে ওঠার ভয় বাড়ছে
সরকার বলছে সঞ্চার সাথী মূলত চুরি যাওয়া বা ভুয়ো ফোন শনাক্ত করার কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যবহারকারী কোনওভাবেই এটি মুছতে পারবেন না—এই বিধানই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কোনও অ্যাপকে অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ঢুকতে দিলে সেটি ভবিষ্যতে যে সর্বক্ষণিক লোকেশন ট্র্যাকার বা আরও বিস্তৃত নজরদারি টুলে পরিণত হবে না—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে—আজ IMEI ট্র্যাকিং, কাল কি ডিজিটাল আইডি বা VPN নিষিদ্ধের মতো নতুন ক্ষমতা যুক্ত হবে?
২. ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
মোবাইল ফোন আইনত ব্যক্তিগত সম্পত্তি - যেখানে থাকে বার্তা, নথি, ছবি, কাজের তথ্যসহ অজস্র সংবেদনশীল ডেটা। সমালোচকদের যুক্তি, একবার কোনও অ্যাপকে এমন সার্বক্ষণিক অধিকার দিলে এনক্রিপ্ট না-করা ডেটা বা ফোনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সরকারের নজরে পড়বে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়? ভবিষ্যতের কোনও আপডেটে অ্যাপের ক্ষমতা বাড়ানো হবে না—সেটাই বা কে বলবে? এই কারণেই অনেকেই বলছেন, এটি সরাসরি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে সরকারের দায়বদ্ধতার ঘাটতি
নতুন ডেটা প্রোটেকশন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কঠোর নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বহু ছাড় রয়েছে। ফলে ডেটা অপব্যবহার হলে নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার রাস্তা সীমিত। বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপের নির্দেশ সেই ফাঁকটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এটাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি অনুমোদনে
স্মার্টফোনে বাণিজ্যিক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ আগে থেকেই প্রি-ইনস্টল থাকা নতুন কিছু নয়। তবে এবার সরকার নিজেই এমন একটি অ্যাপ চাপিয়ে দিচ্ছে—যা মুছতেও দেওয়া হবে না। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের বক্তব্য, এতে ফোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাত থেকে আরও সরে যাবে।
৫. কোনও জনমত, কোনও খসড়া - কিছুই প্রকাশ না করেই সিদ্ধান্ত
টেলিকম দফতরের নীতি–প্রণয়নের স্বচ্ছতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। সঞ্চার সাথীকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তেও জনপরামর্শ নেওয়া হয়নি, প্রকাশ করা হয়নি কোনও খসড়াও। হঠাৎই সরাসরি নির্দেশ জারি হয়েছে। বিরোধী মহল ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ—এটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একতরফা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত।