কার্নির এই সফরকে ভারত-কানাডা সম্পর্কের ‘রিসেট’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তাঁর পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোর আমলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, বিশেষ করে ২০২৩ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কানাডার অভিযোগ ঘিরে। ভারত সেই অভিযোগ শুরু থেকেই জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।

মার্ক কার্নি এবং নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 26 January 2026 21:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতে আসতে পারেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (Canada PM Mark Carney)। এই সফরে শক্তি, খনিজ, পরমাণু সহযোগিতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সহ একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কানাডায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ পাটনায়েক জানিয়েছেন, এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
পাটনায়েকের কথায়, মার্ক কার্নির ভারত সফরে (Mark Carney India Tour) ইউরেনিয়াম সরবরাহ, তেল ও গ্যাস, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের পাশাপাশি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত একগুচ্ছ চুক্তি সই হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল প্রায় ২.৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মূল্যের ১০ বছরের ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে চলতি সপ্তাহেই ভারতে এসেছেন কানাডার শক্তিমন্ত্রী টিম হগসন (Tim Hodgson)। তিনি জানিয়েছেন, ভারত-কানাডা পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির আওতায় ভবিষ্যৎ সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হবে, তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও নজরদারির শর্ত মেনেই। পাশাপাশি শক্তি ও খনিশিল্পকে দুই দেশের সহযোগিতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) লেনদেন নিয়েও কথাবার্তা হতে পারে।
কার্নির এই সফরকে ভারত-কানাডা সম্পর্কের (India Canada Relations) ‘রিসেট’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তাঁর পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোর আমলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, বিশেষ করে ২০২৩ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কানাডার অভিযোগ ঘিরে। ভারত সেই অভিযোগ শুরু থেকেই জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
বাণিজ্য ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত মিলছে। পাটনায়েক জানিয়েছেন, মার্চ মাস থেকেই ভারত ও কানাডার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। প্রায় দু’বছর ধরে থমকে থাকা এই আলোচনা গত নভেম্বরে পুনরায় চালু করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়। তাঁর দাবি, আলোচনা শুরু হলে এক বছরের মধ্যেই সিইপিএ চূড়ান্ত করা সম্ভব।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার আবহে কানাডা নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার পথে হাঁটছে। ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের মঞ্চে মার্ক কার্নি স্পষ্টই বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ছে এবং মধ্যম শক্তিগুলিকে নতুন জোট গড়ে তুলতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কানাডা যদি চিনের সঙ্গে কোনও বড় বাণিজ্য চুক্তিতে যায়, তবে তার উপর কঠোর শুল্ক চাপানো হতে পারে। এই ধরনের বক্তব্য উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডা বিকল্প অংশীদার খুঁজতে সক্রিয় হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগকেও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কানাডায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ পাটনায়েক জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার জবাব দিতেই ভারত ও কানাডা দ্রুত নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশই বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে - যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে ভারত ও কানাডা উভয় দেশই দ্রুত নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। সামনের মাসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যমন্ত্রী পীয়ুষ গোয়েল ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের কানাডা সফরও হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
নিজ্জর হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে পাটনায়েক জানিয়েছেন, কানাডার আদালতে মামলাটি এখনও বিচারাধীন। ভবিষ্যতে যদি কোনও ভারতীয় নাগরিকের যুক্ত থাকার প্রমাণ মেলে, তবে ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে - এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।