শুক্রবার বিহার বিধানসভা ভোটের ফলাফল (Bihar Election Result 2025) স্পষ্ট হতেই যে অবধারিত ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এর কতটা প্রভাব পড়তে পারে বাংলায় (West Bengal)। তৃণমূল (TMC) কি উদ্বেগে, ভয় পাচ্ছে? বিহারে ফল (Bihar Exit Poll 2025) ঘোষণা হতেই দেখা গেছে, বিজেপির (BJP) জাতীয় স্তরের নেতারাও বলতে শুরু করেছেন—অঙ্গ ও কলিঙ্গের পর এবার বঙ্গ দখলের পালা!

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস।
শেষ আপডেট: 28 November 2025 16:01
শুক্রবার বিহার বিধানসভা ভোটের ফলাফল (Bihar Election Result 2025) স্পষ্ট হতেই যে অবধারিত ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এর কতটা প্রভাব পড়তে পারে বাংলায় (West Bengal)। তৃণমূল (TMC) কি উদ্বেগে, ভয় পাচ্ছে? বিহারে ফল (Bihar Exit Poll 2025) ঘোষণা হতেই দেখা গেছে, বিজেপির (BJP) জাতীয় স্তরের নেতারাও বলতে শুরু করেছেন—অঙ্গ ও কলিঙ্গের পর এবার বঙ্গ দখলের পালা!
যে কোনও রাজনৈতিক দলেই এ ধরনের প্রত্যয় দেখায়। বিজেপিও ব্যতিক্রম নয়। কৌতূহলের বিষয় হল, একথা কতটা যুক্তি ও তর্ক সঙ্গত, বিজেপির পক্ষে কী কী ফ্যাক্টর কাজ করতে পারে, এবং কোন কোন ব্যাপারে বিজেপি এখনও সুবিধা করে উঠতে পারেনি।
গোড়াতেই জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, বিহার (Bihar) ও বাংলার (West Bengal) রাজনীতির গতিশীলতা ভিন্ন। তাই বিহারে যে সূত্র কাজ করেছে, বাংলায় তা কাজ করবেই এর কোনও মানে নেই। ভুলে গেলে চলবে না, ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের ঠিক ৬ মাস আগে বিহারে জিতেছিল বিজেপি। তার বিশেষ কোনও প্রভাব বাংলায় পড়তে দেখা যায়নি। বরং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়ার সামনে দু’শ পার করে ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল।
মহিলাদের ১০ হাজার টাকা
বিহারে এবারের ভোটে অন্যতম গেম চেঞ্জার হয়ে উঠেছে মহিলাদের জন্য একটি এককালীন অনুদান। ভোটের ঠিক আগে সেপ্টেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা শুরু করে নীতীশ সরকার (Nitish Kumar)। তার পর বিহারের ১ কোটি ২৩ লক্ষ মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১০,০০০ টাকা করে পাঠিয়ে দেয় তাঁর সরকার।
এবার বিহার ভোটে দেখা যায়, মহিলাদের যোগদান এক লাফে ১২ শতাংশ বেড়ে গেছে। তা দেখে তামাম, রাজনৈতিক পণ্ডিতেরও ধারণা যে, এই এক অস্ত্রেই বিহার জয় করে ফেলেছেন নীতীশ। নইলে প্রায় ২০ বছর বিহারে মুখ্যমন্ত্রী পদে থেকে নীতীশ কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো উন্নয়ন বা শিল্পায়ণের লক্ষ্যে এমন কিছু করতে পারেননি যে তাঁর সরকার নিয়ে মানুষ খুশি থাকতে পারত। বরং তা ছিল না বলেই, ১০ হাজার টাকা দেওয়ার খেলাটা খেলতে হয়।
মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এভাবে টাকা পাঠানোর রেওয়াজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই (Mamata Banerjee) আগে শুরু করেছিলেন। হিসাবমতো বাংলায় ২ কোটির বেশি মহিলাকে মাসে ১ হাজার টাকা করে দেয় তাঁর সরকার। অর্থাৎ বছরে ১২ হাজার টাকা। তফসিলি জাতি ও উপজাতি মহিলারা পান বছরে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ বিহারের থেকে বেশি।
শুধু তা নয়, গত আর্থিক বছর ও চলতি আর্থিক বছরে রাজ্যের ২৮ লক্ষ পরিবারকে বাড়ি বানানোর জন্য দুই কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। অর্থাৎ সরাসরি সুবিধা পেয়েছেন ১ কোটি ১২ লক্ষ মানুষ। বাংলায় ভোটার সংখ্যা ৭.৬ কোটি (SIR-এর আগে)। হিসাবমতো তার ৩৫ শতাংশ বা তার বেশি মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দুটি প্রকল্পের উপভোক্তা।
এই বিষয়টি যে তাঁদের সামনে চিনের প্রাচীরের মতো তা বিজেপিও জানে। এবং সেই কারণেই সুকান্ত মজুমদাররা বলছেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের চেয়ে ১ টাকা হলেও বেশি দেবেন।
তবে ঘটনা হল, এই টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছেন তা বিজেপির নেই। বিহারে ঠিক যেমন তেজস্বী যাদব, মহিলাদের ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা বলেও সুবিধা করতে পারেননি, বাংলাতেও সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে শুভেন্দু-সুকান্তদের।
মুসলিম ভোট
বিহারে এবার ভোটের ফলাফল ঘোষণার আগে টুডেজ চাণক্য তাদের এক্সিট পোলে জানিয়েছিল, এনডিএ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মুসলিম ভোট পেতে পারে। এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বিহারে বিজেপির সঙ্গে জোটে থাকলেও রাজ্যে কখনও উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেননি নীতীশ। তিনি প্রতি বছর ইফতার পার্টিতেও যান ফেজ টুপি পরে। রামবিলাস পাসোয়ানের দল লোক জনশক্তি পার্টিও সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য কথা বলেন। অর্থাৎ বিহারে এনডিএ-র সরকার থাকলেও নীতীশ মুসলিমদের জন্য সেফটি ভালভ হয়েছিলেন। হতে পারে মহিলাদের জন্য ১০ হাজার টাকার প্রকল্পের সুবিধা মুসলিম মহিলারাও পেয়েছেন। এবং তার ফল পেয়েছে এনডিএ।
তবে বিহারে সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসিয়ে এবার এনডিএ-কে বিশাল সাহায্য করে দিয়েছে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এমআইএম। গোটা সীমাঞ্চল অঞ্চলে ৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে মিম। আসন ধরে ধরে তারা কংগ্রেস ও জেডিইউ-র যাত্রা ভঙ্গ করেছেন। প্রশ্ন হল, বাংলায় মিম বা নওসাদ সিদ্দিকিরা প্রার্থী দিলে বিহারের মতো ভোট পাবেন কিনা। কারণ, বাংলায় মুসলিমদের কাছে নীতীশ কুমারের মতো কোনও সেফটি ভাল্ভ এখনও নেই। শুভেন্দু অধিকারী যেরকম উগ্র হিন্দুত্বের কথা বলছেন, তাতে বিজেপিকে ঠেকাতে সংখ্যালঘু ভোটার সম্পূর্ণ মেরুকরণের সম্ভাবনাই ফের প্রবল হয়ে উঠতে পারে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে। নওসাদের সভায় ঢেলে লোক হলেও তা ভোট বাক্স অবধি পৌঁছয়নি।
বাংলা ও বাঙালি
বিজেপির বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র গত ৫-৭ বছর ধরে লাগাতার ব্যবহার করে চলেছে তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা হল, বিজেপি বাংলার সহজাত রাজনৈতিক দল নয়। হিন্দি বলয়ের পার্টি। যারা রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ নিয়ে বাংলা দখলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাঁরা বাংলার সংস্কৃতি বোঝেন না, বাংলার মানুষের উদার মনোভাব উদার পরিবেশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাঁরা ক্ষমতায় এলে বাংলায় মানুষের স্বাভাবিক মেলামেশা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, মানুষ কী খাবে কী পরবে তাও ঠিক করে দিতে চাইবে।
তৃণমূলের এই প্রচার সত্ত্বেও বাংলায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। তা ছাড়া আরও বাঙালি হয়ে উঠতে কালীঘাট-দক্ষিণেশ্বরও করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলায় প্রচারে এলে মঞ্চে রাখা হচ্ছে মা কালীর ছবি। কিন্তু তার পরেও বিজেপি পুরোপুরি বাংলা ও বাঙালির পার্টি হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা
বাংলায় একটানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল। এমনিতেই টানা বেশিদিন ক্ষমতায় থাকলে সরকারের বিরুদ্ধে একটা স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও তা রয়েছে। কোনও কোনও সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তীব্র আকার ধারন করে রাস্তায় আছড়ে পড়তেও দেখা গেছে। এহেন অবস্খায় বিজেপি উন্নয়নের কী বিকল্প মডেল দেখাতে পারে, সেটা অবশ্যই বিচার্য বিষয়।
বিহারে টানা ২০ বছর এনডিএ ক্ষমতায় থেকেও গোটা রাজ্যকে যে খুব চকচকে ও উজ্জ্বল করে তুলতে পেরেছে তা নয়। রাজ্যে কোনও শ্রম নিবিড় বড় কারখানাও হয়নি। রাতারাতি তারা তা বাংলায় করে দেখাতে পারবে, সেটা বাংলার মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে বোঝানো কম কঠিন কাজ নয়।
ধর্মীয় মেরুকরণ
বিজেপি মনে করে, বিহারে শুধু মাত্র মহিলাদের ১০ হাজার টাকা দেওয়াই এই ভোটের অনুঘটক ছিল না। অপারেশন সিঁদুরের পর বিহারে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্রতর হয়েছে। তার ফলে যাদব, ভূমিহার, অতি পিছড়েদের ভোট বাক্সে ফাটল ধরেছে এবং হিন্দুরা আরও বেশি করে তাদের সঙ্গে জুড়েছে। বাংলাতেও এবার ধর্মীয় মেরুকরণ সম্পৃক্ত অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে। বাম ও কংগ্রেসের ভোট আরও কমে গিয়ে তা বিজেপির ঝুলিতে ঢুকতে পারে। সেটা বিজেপির জন্য অন্যতম প্লাস পয়েন্ট বইকি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপির মুখ
বাংলায় তৃণমূলের কাছে সর্বদাই একটা অতিরিক্ত বিষয় হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও বাংলায় সব রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রীর তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর রাজনৈতিক ওজনের সমতুল কোনও নেতা বিরোধী শিবিরে নেই। এই বিষয়টি কিছুটা হলেও এগিয়ে রেখেছে তৃণমূলকে।
সব মিলিয়ে বিহার ভোটের কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলায় থাকবে বলে মনে হয় না। তবে হ্যাঁ, প্রতিটা জয় সেই রাজনৈতিক দলকে অক্সিজেন জোগায়, কর্মীদের মনোবল বাড়ায়। পূর্ব ভারতে বিজেপি ইতিমধ্যে তাদের আধিপত্য কায়েম করে ফেলেছে। অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, বিহার ও ওড়িশায় তারা ক্ষমতায় রয়েছে। বিহারে বিপুল জয় বাংলায় বিজেপি কর্মীদের মনোবল অবশ্যই বাড়াবে। তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের মনেও উদ্বেগের সঞ্চার করতে পারে। তবে তার অতিরিক্ত কোনও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা এখনই দেখা যাচ্ছে না। কারণ, বাংলা ও বিহারের রাজনৈতিক গতিশীলতা ভিন্ন।