এই বিপুল ভোটদানের হারে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল জল্পনা। এনডিএ ও মহাগঠবন্ধন — উভয় জোটই এই রেকর্ড অংশগ্রহণকে নিজেদের পক্ষে বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যখনই বিহারে ভোটদানের হার এমনভাবে বেড়েছে, তখনই রাজ্যে ঘটেছে ক্ষমতার পরিবর্তন।

নরেন্দ্র মোদী- অমিত শাহ।
শেষ আপডেট: 7 November 2025 13:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের (Bihar Election 2025) প্রথম দফায় ভোটদানের হার নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছে। বৃহস্পতিবার ১৮টি জেলায় ১২১টি বিধানসভা আসনে ভোট হয়েছে, যেখানে ৩.৭৫ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ — অর্থাৎ ৬৪.৬৬ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ২০২০ সালের প্রথম দফার ভোটে এই হার ছিল মাত্র ৫৬.১ শতাংশ। অর্থাৎ, এবারে ৮.৫ শতাংশ বেড়েছে ভোটদান (Bihar record poll percentage)— যা বিহারের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই বিপুল ভোটদানের হারে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল জল্পনা। এনডিএ ও মহাগঠবন্ধন — উভয় জোটই এই রেকর্ড অংশগ্রহণকে নিজেদের পক্ষে বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যখনই বিহারে ভোটদানের হার এমনভাবে বেড়েছে, তখনই রাজ্যে ঘটেছে ক্ষমতার পরিবর্তন।
বিহার নির্বাচনে ভোট দানের ইতিহাস
বিহারের ভোটের পরিসংখ্যান তুলে ধরছে এক আকর্ষণীয় তথ্য। যতবারই ভোটের হার ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে, ততবারই সরকার পাল্টেছে।
১৯৬৭ সালে ভোট বেড়েছিল ৪৪.৫% থেকে ৫১.৫%— ৭ শতাংশ বৃদ্ধি। ফলাফল: কংগ্রেসের প্রথম হার, অ-কংগ্রেসি জোটের উত্থান।
১৯৮০ সালে ভোটের হার ৫০.৫% থেকে বেড়ে হয় ৫৭.৩%— বৃদ্ধি প্রায় ৭%। কংগ্রেস ফিরে পায় ক্ষমতা, জনতা সরকারে পতন।
১৯৯০ সালে ৫৬.৩% থেকে বেড়ে ভোট পড়ে ৬২% — ৫.৭% বৃদ্ধি। কংগ্রেসের বিদায়, ক্ষমতায় লালুপ্রসাদ যাদবের জনতা দল।
২০০৫ সালে যদিও ভোটের হার কমেছিল প্রায় ১৬%, কিন্তু তবুও পাল্টে যায় সরকার— প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার।
এবারও ভোটের হার বেড়েছে ৮.৫% — যা স্বাধীনতার পর থেকে অন্যতম বৃহৎ বৃদ্ধি, যা ইতিমধ্যে জল্পনা উস্কে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “বিহারে ভোট যত বাড়ে, পরিবর্তনের বার্তা তত জোরালো হয়।”
প্রথম দফার ভোটের বিশ্লেষণ
এই প্রথম দফায় ভোট হয়েছে গঙ্গার দক্ষিণের ১৮টি জেলায়। যার মধ্যে রয়েছে মিথিলাঞ্চল, কোসি, মুঙ্গের, সারণ ও ভোজপুর অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলো বিহারের রাজনৈতিক ব্যারোমিটার হিসেবে ধরা হয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে এই ১২১ আসনে ফলাফল ছিল প্রায় সমানে সমান:
মহাজোট –৬১টি আসন
এনডিএ –৫৯টি আসন
এর মধ্যে আরজেডি একাই পেয়েছিল ৪২টি আসন, বিজেপি ৩২টি, জেডিইউ ২৩টি, কংগ্রেস ৮টি, আর বাম দল ১১টি। ছোট দলগুলি — যেমন ভিআইপি, এলজেপি প্রভৃতি — বাকি আসন ভাগ করে নিয়েছিল। তবে এবার সমীকরণ একেবারে বদলে গেছে। চিরাগ পাসোয়ান (এলজেপি) ও উপেন্দ্র কুশওয়াহা (আরএলএসপি), যাঁরা ২০২০ সালে এককভাবে লড়েছিলেন, এখন এনডিএ-র শরিক। অন্যদিকে, মুখেশ সাহানির ভিআইপি দল এবার যোগ দিয়েছে মহাগঠবন্ধনে। এছাড়া, আরজেডির তরুণ মুখ তেজস্বী যাদব এ বার আরও আক্রমণাত্মক প্রচার করেছেন, তাঁর স্লোগান — “হয় এবার নয় নেভার”— রাজ্যের যুবসমাজের মধ্যে ভালো সাড়া ফেলেছে।
জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর সুপ্রিমো নীতীশ কুমার বিহারের রাজনীতিতে এখন এক বৃদ্ধ চরিত্র। বহুবার দল ও জোট বদল করায় তাঁর নাম হয়েছে ‘পলটু চাচা’। এবারে তাঁর সামনে দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ — একদিকে, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ধারা বজায় রেখে ফের ক্ষমতায় ফেরা; অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তনের ইচ্ছাকে প্রতিহত করা।
প্রশ্ন এখন একটাই — এই রেকর্ড ভোটদানের মানে কী? পরিবর্তনের হাওয়া, না কি বর্তমান সরকারের প্রতি নতুন আস্থা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “উচ্চ ভোটদানের হার অনেক সময় সরকারবিরোধী ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু সবসময় নয়। কোথাও কোথাও তা প্রো-ইনকামবেন্সিও হতে পারে।” বিহারের গ্রামীণ অঞ্চলে এ বছর মহিলাদের ভোটদানের হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যা নীতীশ কুমারের সামাজিক প্রকল্পগুলির প্রতি আস্থা বাড়ার ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যদিকে, যুব ভোটারদের মধ্যে তেজস্বীর প্রতি প্রবল আগ্রহ— যা মহাগঠবন্ধনের পক্ষে যেতে পারে।
সামনে দ্বিতীয় দফা ভোট ও ফলাফল ঘোষণা
দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ১১ নভেম্বর, আর ফলাফল প্রকাশ পাবে ১৪ নভেম্বর। সেদিনই নির্ধারিত হবে, বিহারে কি নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে, না কি নীতীশ কুমার আরও একবার ইতিহাস লিখবেন।