ওড়িশায় কাজ করতে যাওয়া বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের উপর ক্রমাগত হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অবিলম্বে হেনস্থা বন্ধ ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে তারা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 3 July 2025 17:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওড়িশায় কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের উপর ভাষাগত বৈষম্য ও পুলিশের হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের মুখ্যসটিব মনোজ পন্থ এই প্রসঙ্গে এক তীব্র প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছেন ওড়িশার মুখ্যসচিব মনোজ আহুজার কাছে।
চিঠিতে মনোজ পন্থ উল্লেখ করেন, রাজ্যের শ্রমিকরা যারা মূলত নিম্ন আয়ের পরিবারের অন্তর্গত, যাঁরা দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা গৃহকর্মীর মতো কাজ করেন, তাঁরা জীবিকার তাগিদে ওড়িশার বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁদের চিহ্নিত করে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো হচ্ছে, এমনকি গ্রেফতারও করা হচ্ছে।
চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র বাংলা বলার জন্য যদি কাউকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ধরা হয়, তাহলে তা একদিকে আইনি বিচ্যুতি, অন্যদিকে একটি ভাষা ও জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নির্মিত সামাজিক বৈষম্যও বটে। তিনি বলেন, “এটা শুধু অনুচিত বা অন্যায় নয়, বরং পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্ট এবং অপমানজনক।”
চিঠিতে উঠে এসেছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া অভিযোগে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের বহু বাসিন্দা যাঁরা আইন অনুযায়ী সঠিক পরিচয়পত্র যেমন আধার, ভোটার আইডি, রেশন কার্ড ইত্যাদি সঙ্গে রেখেছেন, তাঁরাও ওড়িশা পুলিশের হেনস্থার মুখে পড়ছেন। সরকারি রেকর্ডে পর্যন্ত তাঁদের থাকার প্রমাণ রয়েছে, তবু তাঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এমনকি অনেক সময় তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে, তাঁদের গ্রেফতার করা হচ্ছে বা কাজ হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পুলিশের এই ধরনের আচরণ স্থানীয় প্রশাসনের প্রশ্রয়ে আরও বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যে এই ধরনের একাধিক ঘটনার তথ্য হাতে পেয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা যথাযথ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ এখনও পর্যন্ত এই সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান বা স্বস্তি মেলেনি।
এই প্রেক্ষিতে মুখ্যসচিব ওড়িশা সরকারের কাছে স্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সন্দেহ রয়েছে, তাঁদের ন্যায্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাচাই করা হোক। যথাযথ কাগজপত্র জমা দিলে কোনও ব্যক্তিকে ‘অবৈধ’ বলা যাবে না। পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাতে স্বেচ্ছাচারিতা না হয়, সেই বিষয়ে কড়া নজরদারি রাখা হোক। বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের উপর ভিত্তিহীন অভিযোগের তদন্ত হোক ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যাঁরা হেনস্থার শিকার হয়েছেন, তাঁদের উপযুক্ত আইনি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
চিঠির শেষে মনোজ পন্থ লেখেন, 'এই বিষয়ে অবিলম্বে সংবেদনশীল ও মানবিক হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। আশা করি আপনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতির দ্রুত নিষ্পত্তি করবেন।'
এই চিঠি সামনে আসার পর বিষয়টি রাজনৈতিক মহলেও আলোড়ন তুলেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, “এ কীভাবে সম্ভব, একজন ভারতীয় নাগরিক শুধুমাত্র তাঁর মাতৃভাষায় কথা বলছেন বলেই তাঁকে সন্দেহ করা হবে?” মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটা জাতীয় সংহতির ওপর সরাসরি আঘাত।
বাংলাভাষীদের স্বার্থ রক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার কী পদক্ষেপ করে এবং ওড়িশা সরকার কতটা সহযোগিতা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।