ভারতের আঞ্চলিক সাহিত্য আন্তর্জাতিক স্তরে অনন্য সম্মান অর্জন করল। লেখিকা বানু মুশতাক (Banu Mushtaq) ও অনুবাদক দীপা ভাস্তি (Deepa Bhasti) যৌথভাবে জিতলেন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৫ (International Booker Prize 2025)।

শেষ আপডেট: 21 May 2025 14:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের আঞ্চলিক সাহিত্য আন্তর্জাতিক স্তরে অনন্য সম্মান অর্জন করল। লেখিকা বানু মুশতাক (Banu Mushtaq) ও অনুবাদক দীপা ভাস্তি (Deepa Bhasti) যৌথভাবে জিতলেন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৫ (International Booker Prize 2025)। কন্নড় ভাষায় লেখা বানু মুশতাকের গল্পসংকলন ‘হার্ট ল্যাম্প’ (Heart Lamp), যা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দীপা ভাস্তি। প্রথমবারের মতো এই পুরস্কার দেওয়া হল কোনও ছোটগল্পের সংকলন ও কোনও কন্নড় গ্রন্থকে।
মঙ্গলবার লন্ডনের টেট মডার্নে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যের এই সম্মান ঘোষণা করা হয়। ৭৭ বছর বয়সি আইনজীবী ও সমাজকর্মী বানু মুশতাক ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রচিত বারোটি ছোটগল্প বেছে এনেছেন এই সংকলনে, যেখানে উঠে এসেছে মুসলিম মহিলাদের জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম, দমন, লিঙ্গবৈষম্য ও অপ্রতুল জীবনের স্পষ্ট চিত্র।
পুরস্কার হাতে নিয়ে বানু মুশতাক বলেন, “এই মুহূর্ত যেন হাজারো জোনাকির আলোয় এক আকাশ আলোকিত হওয়া—ছোট, ঝলমলে, কিন্তু সবার জন্য এই আলো। এই সম্মান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন ও একে অপরকে তুলে ধরার যে যৌথ স্বপ্ন, তারই জয়।”
বানু মুশতাকের গল্পগুলিতে মহিলাদের জীবনের অতল দুঃখবোধ, আশাভঙ্গের জলছবি রয়েছে। কখনও বা তুলে ধরা হয়েছে বিদ্রূপাত্মক হাস্যরসের মাধ্যমে। যেমন ‘Be a Woman Once, Oh Lord!’ শীর্ষক গল্পে, একজন মহিলা ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বলেন— “জগৎ যদি আবার সৃষ্টি করো, তবে নিজেই একবার মহিলা হয়ে এসো পৃথিবীতে, প্রভু!”
‘Stone Slabs for Shaista Mahal’ গল্পে দেখা যায়, এক স্বামী স্ত্রীর উদ্দেশ্যে তাজমহলের চেয়ে সুন্দর প্রাসাদ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাকে ভুলে যায়। ফলত, পড়াশোনা বিসর্জন দিয়ে তাঁর মেয়েকেই সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়।
দীপা ভাস্তির অনুবাদকে পুরস্কারজুরি প্রধান ম্যাক্স পোর্টার যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাও গায়ে কাঁটার দেওয়ার মতই। তাঁর কথায়, এ হল ‘ভাষাকে নাড়িয়ে দেওয়া এক বিপ্লবী অনুবাদ’। তাঁর মতে, “এই গল্পগুলি কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্যে নয়, নারীর অধিকার, ধর্ম, জাত, ক্ষমতা ও নিপীড়নের জটিল স্তরগুলি ফুটিয়ে তুলেছে।”
এর আগে ২০২২ সালে গীতাঞ্জলি শ্রী তাঁর হিন্দি উপন্যাস ‘রেত সমাধি’ (Tomb of Sand)-এর জন্য আন্তর্জাতিক বুকার জেতেন। এবার বানু মুশতাক হয়ে উঠলেন দ্বিতীয় ভারতীয় লেখক এবং প্রথম কন্নড় ভাষার প্রতিনিধি যিনি এই সম্মানে ভূষিত হলেন।
পুরস্কারপ্রাপ্তির পর বানু মুশতাক বলেন, “এই বই কোনও স্থানীয় গল্পের সংকলন নয়, বরং এ বিশ্বজনীন গল্পের আঙ্গিকে রচিত”। অন্যদিকে দীপা ভাস্তি বলেন, “বিশ্বের ইতিহাস মূলত মুছে ফেলারই ইতিহাস—বিশেষ করে মহিলাদের কণ্ঠস্বর ও কৃতিত্ব প্রায়শই অদৃশ্য করে দেওয়া হয়। এই পুরস্কার আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যিকদের আরও সামনে আসার পথ খুলে দেবে।” ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর জয় প্রমাণ করে দিল, ভাষা যতই স্থানিক হোক না কেন, গল্প যদি হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে, তবে তার পরিসর হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন।