কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ভারতের সামনে যে চ্যালেঞ্জ ছিল, তা ছিল মানবিক ও অস্তিত্বের প্রশ্ন—একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত।

শেষ আপডেট: 18 December 2025 20:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশের (Bangladesh) বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভারতের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে সাফ জানাল সংসদের স্থায়ী কমিটি। কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির মতে, পরিস্থিতি হয়তো সরাসরি বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্যের দিকে যাচ্ছে না, কিন্তু এখনই যদি ভারত কৌশলগত পুনর্মূল্যায়ন না করে, তা হলে ঢাকায় ভারতের গুরুত্ব ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি কেন চ্যালেঞ্জ?
কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ভারতের সামনে যে চ্যালেঞ্জ ছিল, তা ছিল মানবিক ও অস্তিত্বের প্রশ্ন—একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকেও ভিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা এবং ভারতের থেকে সরে গিয়ে নতুন কৌশলগত জোট গঠনের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মত কমিটির।
চিন ও পাকিস্তানের ইন্ধন
রিপোর্টে বাংলাদেশের অস্থিরতার পেছনে একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি মৌলবাদী শক্তির উত্থান, বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষয়। কমিটির মতে, এই সব পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের বিদেশনীতি ও কৌশলগত অবস্থান ধীরে ধীরে ভারতের বিপরীত মেরুর দিকে ঝুঁকছে।
সাবমেরিন থ্রেট ও জামাতের চিন সফর
বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে। পরিকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর সম্প্রসারণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে চিনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। মঙ্গলা বন্দরের সম্প্রসারণ, লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি এবং পেকুয়ায় সাবমেরিন ঘাঁটির মতো প্রকল্পগুলির উল্লেখ করে কমিটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের হাতে মাত্র দু’টি সাবমেরিন থাকলেও সেখানে আটটি সাবমেরিন রাখার মতো পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
চিন যে শুধু রাষ্ট্রীয় স্তরেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, তা-ও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি জামাত-ই-ইসলামির প্রতিনিধিরা চিন সফর করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে কমিটির সুপারিশ, বাংলাদেশে কোনও বিদেশি শক্তি যেন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে কড়া নজরদারি চালাতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঢাকাকে তুলনামূলক সুবিধা দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করার পথ খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উদ্বেগজনক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে কমিটি। আগে নিষিদ্ধ থাকা জামাত-ই-ইসলামির নির্বাচনী স্বীকৃতি ফেরানো হয়েছে, যার ফলে তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামি লিগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা তাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাইরে ঠেলে দিয়েছে। কমিটির মতে, এর ফলে ভবিষ্যতের নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বেড়েছে এবং ভারতের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে প্রকাশ্য বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে, যা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের কাছে কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভের জেরে ঢাকাসহ তিনটি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতার পক্ষ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। সব মিলিয়ে শশী থারুর নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটির স্পষ্ট বার্তা—এই মুহূর্তে কৌশলগত ভুল হলে তা যুদ্ধ নয়, বরং ধীরে ধীরে প্রভাব হারানোর মাধ্যমে ভারতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।