ঘটনাটি অসমের শ্রীভূমি জেলার (আগের নাম করিমগঞ্জ)। সেখানে কংগ্রেসের এক কর্মসূচিতে জেলাস্তরের নেতা বিধুভূষণ দাস গান ‘আমার সোনার বাংলা’।

সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 29 October 2025 18:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসমে কংগ্রেসের এক সভায় বাজল ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই শুরু রাজনৈতিক চাপানউতর। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেস এখন ‘বাংলাদেশমুগ্ধ’। তাঁদের বক্তব্য, 'এমন এক সময় এই ঘটনা ঘটল যখন বাংলাদেশের নতুন মানচিত্রে উত্তর-পূর্ব ভারতের বেশিরভাগ অংশকে নিজেদের বলে দেখানো হয়েছে।'
ঘটনাটি অসমের শ্রীভূমি জেলার (আগের নাম করিমগঞ্জ)। সেখানে কংগ্রেসের এক কর্মসূচিতে জেলাস্তরের নেতা বিধুভূষণ দাস গান ‘আমার সোনার বাংলা’। বিজেপি যতই বিষয়টিকে রাজনীতির আঙিনায় আনতে চাক, কংগ্রেস এনিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ।
বিষয়টিকে ‘অযৌক্তিক’ বলছেন অন্যান্যরা। কারণ, ‘আমার সোনার বাংলা’ মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দেশপ্রেমের গান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে তিনি গানটি লিখেছিলেন। গানটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ১৯১১ সালে সেই বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করা হয়।
স্বাধীন হওয়ার বহু বছর পর ১৯৭১ সালে ‘আমার সোনার বাংলা’ কে নিজেদের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় বাংলার প্রকৃতি, মাটি, আর মানুষের প্রতি ভালবাসা উঠে এসেছে। দুই বাংলার বাঙালিরা এখনও গানটি নানা অনুষ্ঠানে গেয়ে থাকেন। এমনকি, দেশের নানা প্রান্তে বাঙালি রেস্তরাঁগুলোর নামেও ‘আমার সোনার বাংলা’ ব্যবহৃত হয়।
ফলে শ্রীভূমি, যা বাংলাদেশের সীমানার খুব কাছাকাছি এবং বরাক উপত্যকার অন্তর্গত, সেখানে এই গান গাওয়া আদৌ আশ্চর্যের নয় বলে মনে করছেন অনেকেই।
এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন কংগ্রেস সাংসদ তথা লোকসভার ডেপুটি লিডার গৌরব গগৈ। তাঁর বক্তব্য, “বিধুভূষণ দাস, ৮০ বছরের একজন প্রবীণ সদস্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়েছেন। বিজেপি বলছে, এটা নাকি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের গান। তারা বুঝতেই পারছে না এই গানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কতটা।”
তিনি আরও বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতের গর্ব, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। একটা বাংলা গান গাওয়া মানে আমাদের ঐতিহ্য ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের উদযাপন, সেটাকে কেন বিকৃতভাবে দেখা হবে?”
তবে বিজেপি কিন্তু নিজের কথায় অনড়। দলের অসম শাখা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, “সংকেত একদম পরিষ্কার। কয়েক দিন আগেই বাংলাদেশ সাহস করে এমন মানচিত্র প্রকাশ করেছে যেখানে গোটা উত্তর-পূর্বকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এখন সেই বাংলাদেশমুগ্ধ কংগ্রেস অসমে বসে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাইছে! এর পরেও কেউ যদি বোঝে না কী পরিকল্পনা চলছে, তাহলে হয় সে অন্ধ নয়তো সহযোগী।”
অসমের মন্ত্রী অশোক সিংহলও লিখেছেন, “বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছে অসমের শ্রীভূমিতে কংগ্রেসের এক সভায়, সেই দেশ, যারা উত্তর-পূর্বকে আলাদা করতে চায়! এখন স্পষ্ট কেন কংগ্রেস বছরের পর বছর বেআইনি মিয়া অনুপ্রবেশকারীদের উৎসাহ দিয়েছে, ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির জন্য, রাজ্যের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট করতেই।”
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে গত বছর সরকার বদলের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন, এখন দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে শোনা যায়। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নের অভিযোগও উঠেছে বার বার। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে সামান্য পরিবর্তন হলেও এখনও সখ্য বজায় আছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী মহম্মদ ইউনুস পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শমশাদ মির্জার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে ইউনুস তাঁকে উপহার দেন নিজের লেখা বই ‘আর্ট অফ ট্রায়াম্ফ: বাংলাদেশ’স নিউ ডন’। বইটির মলাটেই দেখা যায় এমন এক মানচিত্র, যেখানে অসম, অরুণাচল, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরাকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয় বলে অভিযোগ। স্বাভাবিকভাবেই, এই মানচিত্র ও তার পরই কংগ্রেস সভায় রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।