ছাত্রছাত্রীদের ভুল উত্তর যেমন শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সাংসদের বক্তব্যও তেমনই দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনুরাগ ঠাকুর
শেষ আপডেট: 25 August 2025 09:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিমাচল প্রদেশের উনা জেলায় ন্যাশনাল স্পেস ডে উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর (Anurag Thakur)। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তিনি প্রশ্ন করেন—“প্রথম মানুষ কে মহাকাশে গিয়েছিল?” উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে উত্তর দেয়, “নীল আর্মস্ট্রং!” কিন্তু অনুরাগ ঠাকুর পাল্টা বলেন, “আমার মনে হয়, তিনি ছিলেন হনুমানজি( Hanuman)।” এই ভিডিও পরে তিনি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন।
এখানেই শুরু হয় বিতর্ক। একদিকে ছাত্রছাত্রীদের কথা ভুল। নীল আর্মস্ট্রংকে প্রথম মহাকাশচারী বলেছিল তারা। অথচ প্রকৃতপক্ষে ১৯৬১ সালে সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগরিনই প্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরেন। আর্মস্ট্রং অবশ্য ১৯৬৯ সালে প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন। অন্যদিকে একজন সাংসদ পুরাণকথাকে ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দাবি করেছেন, হনুমান ছিলেন প্রথম মহাকাশযাত্রী। ফলে এখানে দুটি বড় ভুল সামনে এসেছে—শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞানহীনতা এবং সাংসদের ইতিহাসের জায়গায় পৌরাণিক কাহিনি উপস্থাপন।
Anurag Thakur : Who was the first space traveller?
Students: Neil Armstrong
Anurag Thakur : No, it's Hanumanji.
This is how these non-scientific id!ots are corrupting young minds.pic.twitter.com/fw1oXU6kce— Tarun Gautam (@TARUNspeakss) August 24, 2025
ভারতের সংবিধানের ৫১ (এ) (h) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও যুক্তিবাদী চেতনা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের সামনে পৌরাণিক কাহিনি যদি বিজ্ঞানের স্থানে শেখানো হয়, তবে শিক্ষার মান কোথায় দাঁড়াবে?
ঠাকুর অবশ্য যুক্তি দেন, উপনিবেশবাদী শিক্ষার সীমারেখা ভাঙতে হবে এবং প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতি গর্ব অনুভব করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এভাবে পুরাণকে বিজ্ঞান হিসেবে পড়ানো কতটা গ্রহণযোগ্য?
রামায়ণ-মহাভারতের মতো মহাকাব্য কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। তবে এগুলি ইতিহাস নয়, বরং সাহিত্য ও পৌরাণিক কাহিনি। ইতিহাস হিসেবে মান্য হতে গেলে প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়। যেমন—গুজরাত উপকূলে ডুবে যাওয়া স্থাপত্যকে কেউ কেউ মহাভারতের দ্বারকা শহরের সঙ্গে মিলিয়েছেন। আবার ট্রয় নগরী একসময় কেবল কল্পকাহিনি ছিল, পরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রমাণ পাওয়া যায়।
কিন্তু হনুমান বা অন্য পৌরাণিক চরিত্রদের মহাকাশযাত্রার কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই এগুলি আস্থা ও সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস নয়।
ছাত্রছাত্রীদের ভুল উত্তর যেমন শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সাংসদের বক্তব্যও তেমনই দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে পার্থক্য বোঝানোই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
পুরাণ কথা অবশ্যই শেখানো যেতে পারে, তবে পুরাণ কথা হিসেবেই। ইতিহাস ও বিজ্ঞানকে বিকৃত করে নয়। শিক্ষা মানে সত্য-মিথ্যা, ইতিহাস-পৌরাণিক কাহিনির পার্থক্য শেখানো।