প্রতিটি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারকে এই নির্দেশ দিয়ে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য (menstrual health) সংবিধানের চোখে একটি মৌলিক অধিকার বলে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক রায়ে জানাল সুপ্রিম কোর্ট।

রাজ্য সরকারগুলি যদি ছাত্রীদের জন্য শৌচাগার ও বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা না করে, তবে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
শেষ আপডেট: 30 January 2026 16:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সব রাজ্যের সমস্ত স্কুলে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড দিতে হবে। প্রতিটি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারকে এই নির্দেশ দিয়ে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য (menstrual health) সংবিধানের চোখে একটি মৌলিক অধিকার বলে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক রায়ে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে (UT) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— সরকারি ও বেসরকারি সব স্কুলে ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি প্যাড দিতে হবে। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও আর মহাদেবনের বেঞ্চ আরও জানায়, সব স্কুলে ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার থাকতে হবে। পাশাপাশি বিশেষভাবে সক্ষম (দিব্যাঙ্গ) শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী শৌচালয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে। স্কুল সরকারি হোক বা বেসরকারি, তাতে কোনও তফাত হবে না।
আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় (Article 21) জীবনের অধিকার মানেই ঋতুকালীন স্বাস্থ্যের অধিকারও। যদি কোনও বেসরকারি স্কুল এই নির্দেশ মানতে না চায়, তাহলে তাদের স্বীকৃতি বাতিল পর্যন্ত করা হতে পারে। একই সঙ্গে আদালত জানায়, রাজ্য সরকারগুলি যদি ছাত্রীদের জন্য শৌচাগার ও বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা না করে, তবে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন জয়া ঠাকুর। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর করা জনস্বার্থ মামলায় তিনি দাবি করেন, দেশের সব স্কুলে কেন্দ্রের ‘ঋতুকালীন স্বাস্থ্যবিধি’ কার্যকর করতে হবে। যাতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীদের সারা দেশে একই সুবিধা পাওয়া যায়। সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার চূড়ান্ত রায় সংরক্ষণ রেখেছে, তবে অন্তর্বর্তী নির্দেশ হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছে।
বিচারপতিরা বলেন, স্কুলে আলাদা শৌচাগারের অভাব আর স্যানিটারি প্যাডের অনুপস্থিতি মেয়েদের মর্যাদা, গোপনীয়তা, সমানাধিকার এবং শিক্ষার সুযোগ, সবকিছুকেই আঘাত করে। এটা কোনও দয়া বা স্বেচ্ছানীতির বিষয় নয়, বরং সরাসরি সংবিধান থেকে আসা অধিকার। আদালত জানায়, মেয়েদের জন্য শৌচাগার ও মাসিক স্বাস্থ্য সামগ্রী না থাকলে সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় (Article 14) সমতার অধিকার, ২১ নম্বর ধারায় জীবন ও মর্যাদার অধিকার এবং ২১এ ধারায় (Article 21A) বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার, সবই লঙ্ঘিত হয়। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, এই সব প্রশ্নের উত্তর একটাই— হ্যাঁ, অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
বেঞ্চ আরও বলে, ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব শিশুকন্যার মর্যাদাকে খর্ব করে এবং তাকে সমাজে সমানভাবে অংশ নেওয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সমতার মানে শুধু আইনগত সমতা নয়, বাস্তবে একই সুযোগ পাওয়া। আর সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকেই মেয়েদের সামনে থাকা বাধাগুলো সরাতে হবে। আদালতের মতে, মর্যাদা মানে এমন জীবন, যেখানে অপমান, বঞ্চনা বা অকারণ কষ্ট নেই। এর সঙ্গে গোপনীয়তা (privacy) পারস্পরিকভাবে জড়িত। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু গোপনীয়তা ভাঙা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং সক্রিয়ভাবে এমন ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে সেটা রক্ষা পায়।
আদালত আরও জানায়, নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ মানে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শিক্ষা ও তথ্য পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। বিচারপতিরা বলেন, স্কুলে শৌচাগার বা ঋতুকালীন সহায়তার অভাব শিক্ষার অধিকারকে সরাসরি ব্যাহত করে। শিক্ষা অধিকার আইন (RTE Act, 2009) অনুযায়ী সব স্কুলকেই নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে হবে। না করলে স্বীকৃতি বাতিল হতে পারে।
এই রায়ে আদালত তিনটি বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে। প্রথমত, সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রত্যেক স্কুলে ব্যবহারের যোগ্য, আলাদা শৌচাগার থাকবে এবং সেখানে পর্যাপ্ত জল থাকবে। দ্বিতীয়ত, নতুন স্কুল তৈরি হলে সেখানে বিশেষভাবে সক্ষমদের কথাও মাথায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, সব স্কুলেই শৌচাগারে ভিতরে পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখতে হবে।
আদালত বলেছে, স্কুলে বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার (menstrual hygiene management) জন্য আলাদা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেখানে অতিরিক্ত ইউনিফর্ম, প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখা থাকবে, যাতে হঠাৎ সমস্যা হলে মেয়েরা সাহায্য পায়। বিচারপতিরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই রায় শুধু উপস্থিত আইনজীবী বা প্রশাসকদের জন্য নয়, বরং সেই সব শ্রেণিকক্ষের জন্য, যেখানে মেয়েরা লজ্জায় কথা বলতে পারে না, সেই সব শিক্ষকের জন্য, যাঁরা সুযোগের অভাবে কিছু করতে পারেন না, সেই সব অভিভাবকের জন্য, যাঁরা বুঝতেই পারেন না মুখ বুজে থাকার ক্ষতি কত বড়, আর গোটা সমাজের জন্য। আদালত শেষ পর্যন্ত বলেছে, সমাজের অগ্রগতি মাপা হয় সবচেয়ে দুর্বলদের কতটা সুরক্ষা দেওয়া যায় তার ভিত্তিতে। এই রায় সেই সব মেয়ের উদ্দেশে বার্তা, যারা ঋতুকালে স্কুলে যেতে পারে না। আদালতের কথায়— দোষ তোমার নয়, দোষ ব্যবস্থার।