আমদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর বুকিং কমেছে ৩০-৩৫%। মানসিক প্রভাব, যাত্রী আতঙ্ক ও আন্তর্জাতিক রুট বাতিল-সহ নানা ঘটনা ঘটে চলেছে পরপর।

এয়ার ইন্ডিয়ার বুকিং কমে গিয়েছে ৩০%
শেষ আপডেট: 20 June 2025 12:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমদাবাদে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়া বিমান ভেঙে পড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরে কেটেছে এক সপ্তাহ। দেশজুড়ে শোক এবং উদ্বেগের ছায়া এখনও মেলায়নি। ঘটনার দিন থেকে এখনও পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে দুর্ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, বহু মানুষ বিমানে যাত্রা নিয়ে আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছেন।
এর ফলে দুর্ঘটনার ছ'দিনের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট বুকিং ৩০-৩৫% কমে গেছে বলে খবর। ব্লু স্টার এয়ার ট্র্যাভেল সার্ভিসেস (ইন্ডিয়া) প্রাইভেট লিমিটেড-এর কর্ণধার মাধব ওঝা জানিয়েছেন, ‘নতুন বুকিং-এ ৩০-৩৫ শতাংশ হ্রাস দেখছি। এর পিছনে একদিকে যেমন বিমান দুর্ঘটনার প্রভাব আছে, তেমনই ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের পরিস্থিতিও প্রভাব ফেলেছে।’
যেমন শুভরাজ প্রসাদ সিং। তিনি ১৯ জুন তাঁর রাঁচি-হায়দরাবাদ বিমানটি বাতিল করেন। এক্স-এ তিনি লেখেন, ‘দুর্ঘটনার পরে আমি ফ্লাইট বাতিল করেছি।’ এমনকি তিনি অভিযোগ করেন, কোনও রিফান্ড বা সহায়তাও পাননি তিনি। অভিনেত্রী মীরা চোপড়াও স্বামী-সহ দুবাই যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন একই কারণে।
বহুল পরিমাণে টিকিট বাতিল
সূত্রের খবর, ১২ জুনের পর এয়ার ইন্ডিয়ার বিদ্যমান বুকিং-এর অন্তত ২০ শতাংশ বাতিল হয়েছে। ওয়ান্ডারঅন ট্র্যাভেল এজেন্সির সিইও গোবিন্দ গৌর বলছেন, ‘৫-৭ শতাংশ যাত্রী অন্য এয়ারলাইনে চলে গেছেন। সব না হলেও স্পষ্টতই বাতিলের প্রবণতা বেড়েছে এয়ার ইন্ডিয়ায়।’
জানা যাচ্ছে, বেশিরভাগ বাতিল হওয়া টিকিট বোয়িং মডেলের বিমানের। যেমন নম্রতা দানি, যিনি মুম্বই থেকে ছেলে ধ্রুবিনকে চেন্নাই পাঠাতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে এয়ার ইন্ডিয়ার পরিবর্তে ইন্ডিগোতে ফ্লাইট বুক করেন।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব, নীরব আতঙ্ক
ইন্ডিয়া অ্যাসিস্টের প্রতিষ্ঠাতা হরিশ খাতরি বলেন, ‘যাত্রীর সংখ্যা খুব একটা কমেনি, কিন্তু মানসিক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যাঁরা খুব কম ভ্রমণ করেন বা পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করেন, তাঁদের মধ্যে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’
শুধু যাত্রীদের তরফে মানসিক আতঙ্কই যে রয়েছে তা নয়। গত ৪৮ ঘণ্টায় বোয়িং ৭৮৭-৮ মডেলের অন্তত ৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বোয়িং-এর নিরাপত্তা পরীক্ষা, বিমানের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথ বন্ধ থাকার মতো কারণও রয়েছে এর পিছনে।
গৌর জানান, বিমানের রুট পরিবর্তন বা মাঝপথে ফিরে আসা জ্বালানি খরচ ও অপারেশনাল ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার রুটে ভাড়া বাড়তে পারে এবং যাত্রীরা হয়তো পূর্ব দিকের রুটের প্রতি আগ্রহী হবেন।
অনেকেই ভ্রমণ করতে চান, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ভ্রমণ ও আতিথেয়তা স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন জ্যোতি মায়াল বলেন, 'বিমান দুর্ঘটনা সাময়িক ভয় সৃষ্টি করলেও ভারতীয়দের দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণ-ইচ্ছায় তেমন প্রভাব পড়েনি।'
‘রেড ডট রিপ্রেজেন্টেশন’-এর প্রভাকর কামাত বলেন, ‘পর্যটকেরা প্রাথমিকভাবে আতঙ্কিত হলেও ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
সাধারণ যাত্রীদের করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আতঙ্ক কমাতে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি:
What if নয়, What is ভাবুন। বিমান এখনও সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহণ মাধ্যম।
বিমান ধরার আগে ডুম-স্ক্রলিং বন্ধ করুন।
সেন্স অ্যাঙ্কার করুন: মন শান্ত করতে সঙ্গীত, মেডিটেশন বা বই পড়ুন।
প্যানিক নয়, পারস্পেক্টিভ বেছে নিন: সিস্টেম ও প্রযুক্তি আপনাকে রক্ষা করতে সক্ষম।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালে ভারতজুড়ে রোড অ্যাক্সিডেন্টে ১.৬ লক্ষের বেশি মৃত্যু হয়েছে, যার ৭০ শতাংশই অতিরিক্ত গতি সংক্রান্ত। সেই তুলনায় বিমান দুর্ঘটনা আজও বিরল।
এয়ার ইন্ডিয়া ও বিমান মন্ত্রকের পদক্ষেপ
এয়ার ইন্ডিয়া তাদের মহারাজা ক্লাব সদস্যদের একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের ৩৩টি বোয়িং ৭৮৭ বিমানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে ২৬টি বিমানে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং DGCA তা ক্লিয়ার করেছে। তবে এই নিরাপত্তা পরীক্ষা, আকাশপথ বন্ধ, রাত্রিকালীন বিধিনিষেধ ও টেকনিক্যাল কারণে গত কয়েক দিনে বহু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ২০ জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ১৫% হ্রাস করবে, যাতে পরিস্থিতি সামলানো যায়। বাতিল হলে যাত্রীদের রিফান্ড বা পুনরায় বুকিংয়ের সুযোগও দেবে তারা।
বিমান মন্ত্রক জানিয়েছে, দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা 'Aircraft Accident Investigation Bureau' ইতিমধ্যেই প্রাথমিক উদ্ধার কাজ শেষ করেছে এবং এখন বিশ্লেষণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আশার আলোও আছে
অভিনেত্রী রাভিনা ট্যান্ডন যেমন ১৭ জুন এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে চড়ে লিখেছেন, ‘নতুন সূচনা… সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আবার উঠে দাঁড়ানো... নীরব সমবেদনা এবং আস্থা।’
কমেডিয়ান বীর দাসও লন্ডন থেকে এয়ার ইন্ডিয়ায় ফিরেছেন এবং টুইটে প্রশংসা করেছেন।
তবে এই মুহূর্তে আতঙ্ক বাস্তব। দুর্ঘটনার ভিডিও, শোকস্তব্ধ পরিবার, একমাত্র জীবিত মানুষটির বেঁচে যাওয়া—সব মিলিয়ে যাত্রীদের মনে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে: যদি আমার জীবনেও এমন হয়? কিন্তু জীবন তো এমনই, কখনও থেমে থাকে না।