আপসহীন কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার লোকসভায় বাজেট প্রস্তাবের উপর আলোচনায় ভাষণ দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

মঙ্গলবার লোকসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 10 February 2026 17:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ …আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব। আপসহীন কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার লোকসভায় বাজেট প্রস্তাবের উপর আলোচনায় ভাষণ দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সাদা জামার উপর কালো রঙের টাইট ফিটিংস গোল গলা সোয়েটারের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল সাদা কলার ও দুটি হাতা। দুহাতে ধরা একটি ট্যাব। পিছনে বসা সপা সাংসদ ডিম্পল যাদব (অখিলেশপত্নী), পাশে খোদ সপা প্রধান অখিলেশ যাদব।
বাজেট প্রস্তাবের আলোচনায় প্রায় ৩৩ মিনিটের ভাষণে অভিষেক এদিন এককথায় শাসকদলকে বুঝিয়ে দিলেন, কোনও চাপের মুখে বাংলার মানুষ তথা ভারতবাসী বিজেপির কাছে মাথা নিচু করবে না। কারণ, এদিন নিজেকে অভিষেক বাঙালি বা তৃণমূল নেতা হিসেবে ভাষণ দেননি, একজন ভারতীয় হিসেবে সরকারকে শূলে চাপান। তাঁর ভাষণের মূল সুর বাঁধা ছিল চড়া স্বরগ্রামে কিন্তু নিঁখুত পেস ও গুড লেন্থে। এককথায় তরুণ-যুব সমাজের প্রতিনিধি অভিষেকের ভাষণ ও ভাষণের পোশাক এবং ট্যাব দেখে বলার রীতিতে বিরোধী শিবিরে হৃদকম্প লেগে গিয়েছে রাজ্য বিধানসভা ভোটের মুখে।
শুরুতেই অভিষেক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বাজেটে আচ্ছে দিনের কথা বলা হলেও রোজ রোজকার জিনিসের দাম বাড়ছে। যাতে দেশের মানুষের উপর কষ্ট আরও বাড়ছে। এদিন বাজেট ভাষণে অভিষেকের কথায় একবারের জন্যও মনে হয়নি, তিনি কোনও আঞ্চলিক দলের নেতা হিসেবে কথা বলছেন। জাতীয় দল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর মতোই দেশ ও জাতীয় সমস্যার সঙ্গেই রাজ্যের কথাও তুলে ধরেন।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের বাজেট প্রস্তাবকে তিনি উল্টো রবিনহুড প্রক্রিয়ার বাজেট বলে মন্তব্য করেন। যেখানে সাধারণ মানুষ যারা সৎভাবে কর দিতে চান, তাঁদের উপর বোঝা চাপানো হয়েছে। এবং যাঁরা কর ফাঁকি দেন, তাঁদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই বাজেটকে তিনি জোর গলার বাজেট, প্রচারের বাজেট বলে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কোনও সমাধান দেখানো হয়নি।
লোকসভায় বাজেট বরাদ্দ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলির প্রতি পরিকল্পিত বঞ্চনা চালাচ্ছে কেন্দ্র। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ অখিলেশ যাদবের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, অর্থমন্ত্রী টানা ৮৫ মিনিট বক্তৃতা দিলেন, অথচ একবারও বাংলার নাম উচ্চারণ করলেন না। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, চলতি বাজেটে যে ডানকুনি ফ্রেইট করিডরের কথা বলা হয়েছে, তার ঘোষণা প্রথম হয়েছিল ২০০৯ সালে, তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই। যিনি আজ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
সংবিধানে রাজ্যগুলির সমানাধিকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তার উল্লেখ করে অভিষেকের অভিযোগ, কেন্দ্র মিত্রদের তহবিলে ভরিয়ে দিচ্ছে, আর বিরোধীদের গলায় অনাহারের ফাঁস পরাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি কোনও ‘সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা’য় ঘটে না। আমি এমন এক ভারতে বাস করি...অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমি এমন এক ভারতে বাস করি, যেখানে ‘জয় বাংলা’ বা ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইলে আপনাকে অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়া হয়। অথচ প্রতিটি মঞ্চ থেকে তারা বলে—‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। কিন্তু আমি যে ভারতের প্রতিনিধি, সেখানে বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রাখা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকার সমান।
কেন্দ্রের কথাবার্তা আর বাস্তবের ফারাক তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ভারতে আজ তিনটি জিনিস নিশ্চিত— চাপ বাড়ছে, কর বাড়ছে, আর বিশ্বাস বারবার ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অভিষেক আরও বলেন, আমি এমন ভারত থেকে এসেছি যেখানে বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করা হয়। আর মাছভাত খেলে মুঘল বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। নেতার এই কথার মধ্যে মধ্যে তৃণমূল সতীর্থরা শেম শেম বলে চিৎকার করে ওঠেন। তিনি বলেন, রাজ্যের টাকা আটকে রাখাটা বড় কথা নয়, এটা রাজ্যবাসীর সম্মানের প্রশ্ন। তা আটকে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজ্য টানা ৭ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা কেন্দ্রকে দিয়ে এলেও পশ্চিমবঙ্গের রাস্তা, বিদ্যুৎ, মনরেগা, এমনকী পানীয় জলের জন্য বরাদ্দ দিচ্ছে না কেন্দ্র।
অভিষেক তীব্র কটাক্ষে বলেন, সাধারণ মানুষকে তিনবার করে কর দিতে হয়। প্রথমে আয়কর, যা বেতন থেকেই কেটে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার তাকে দিতে হয় জিএসটি বাবদ কর। সকালের চায়ের সঙ্গে বিস্কুট থেকে যেখানে সরকারি পরিষেবা পৌঁছায় না, সেখানে পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে জিএসটি। আর তৃতীয় বার কর দিতে হয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে। লোকের মাইনে এক থাকছে। কিন্তু প্রত্যেক মাসে দেখা যাচ্ছে মুদিখানার খরচ থেকে বাচ্চার স্কুলের খরচ বেড়েই চলেছে।
একেবারে শেষের দিকে গলা চড়িয়ে অভিষেক বলতে থাকেন, আমি সেই ভারত থেকে এসেছি যেখানে বাংলা থেকে কোনও শ্রমিক বাইরে কাজে গেলে তাকে অনুপ্রবেশকারী বলে পাকড়াও করা হয়। আমি সেই ভারতের মানুষ যেখানে মণিপুর জ্বলতে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী একবারও সেই রাজ্যে পা রাখেননি। আমি সেই ভারতের লোক যেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলের কেন্দ্রের শাসকদলের বাহিনী। আমি সেই ভারতের লোক, যেখানে মা দুর্গাকে অসীম শক্তি হিসেবে পুজো করা হয়, আবার আমি সেই ভারতের মানুষ যেখানে মা দুর্গার অস্তিত্ব কোথায় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিজেপি নেতারা। শেষে তিনি সংবিধানের প্রস্তাবনার উত্থাপন করে বলেন, সেখানেও লেখা উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া। যার অর্থ সরকার নয়, জনতাই শেষ কথা বলে। সার্বভৌমত্বের কথা বলে। সরকার বা প্রশাসনের কাজ উপর থেকে নীচতলার দিকে কল্যাণ এগিয়ে যাবে। কিন্তু, এখানে তা হচ্ছে না। এই অবিচার চলতে পারে না। শোষণ ও বঞ্চনার একদিন না একদিন অবসান হবেই।