স্বাক্ষর করেননি খোদ লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, স্পিকার অপসারণের প্রস্তাবে বিরোধী দলনেতার স্বাক্ষর করা শোভন নয়— এই নীতিতেই তিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে, ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিকদল তৃণমূল কংগ্রেস এই অনাস্থা প্রস্তাব থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।

স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় তোলা যায় না।
শেষ আপডেট: 10 February 2026 16:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হল ১০ ফেব্রুয়ারি। বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের (INDIA Bloc)-এর অন্তর্ভুক্ত কংগ্রেস সহ আরজেডি, সপা, ডিএমকেরা মিলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla)-র বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিস জমা দিল। অভিযোগ, বাজেট অধিবেশনে স্পিকারের ভূমিকা ছিল একপেশে— বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে (Rahul Gandhi) কথা বলতে না দেওয়া এবং একাধিক বিরোধী সাংসদকে সাসপেন্ড করা তার প্রমাণ।
এই নোটিসে মোট ১১৮ জন সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস (Congress), আরজেডি (RJD), সমাজবাদী পার্টি (Samajwadi Party) এবং ডিএমকে (DMK)। তবে লক্ষণীয়ভাবে, স্বাক্ষর করেননি খোদ লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, স্পিকার অপসারণের প্রস্তাবে বিরোধী দলনেতার স্বাক্ষর করা শোভন নয়— এই নীতিতেই তিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে, ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিকদল তৃণমূল কংগ্রেস এই অনাস্থা প্রস্তাব থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় তোলা যায় না। অন্তত ১৪ দিনের নোটিস পিরিয়ড পার করতে হয়। এই সময়সীমার মধ্যে স্পিকার পূর্ণ ক্ষমতাসহ তাঁর দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। অর্থাৎ, নোটিস জমা পড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে ওম বিড়লার কোনও ক্ষমতা খর্ব হওয়ার নয়। এই ১৪ দিন আসলে রাজনৈতিক উত্তেজনার ‘ওয়েটিং পিরিয়ড’। বাইরে যত বিতর্কই হোক, সাংবিধানিক দৃষ্টিতে এই সময়টা নিছকই প্রক্রিয়াগত।
যেদিন লোকসভায় এই অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনায় উঠবে, সেদিন স্পিকারের আসন ছাড়বেন ওম বিড়লা। তখন অধিবেশন পরিচালনা করবেন ডেপুটি স্পিকার অথবা মনোনীত কোনও সদস্য। তবে চেয়ারে না বসলেও ওম বিড়লা সংসদে উপস্থিত থাকতে পারবেন, বক্তব্য রাখতে পারবেন, নিজের ভূমিকার পক্ষে সাফাই দিতে পারবেন এবং সাধারণ সাংসদ হিসেবে ভোট দিতে পারবেন। একমাত্র ব্যতিক্রম— সমান-সমান ভোট হলে তাঁর কোনও কাস্টিং ভোট থাকবে না।
এই প্রস্তাব পাশ করাতে প্রয়োজন লোকসভার মোট বর্তমান শক্তির অর্ধেকের বেশি সমর্থন। ৫৪৩ আসনের সংসদে এর মানে কমপক্ষে ২৭২টি ভোট। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শাসক জোটের হাতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে বিরোধীদের প্রস্তাব কার্যত রাজনৈতিক বার্তা দিলেও বাস্তবে পাশ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সরকারের স্থায়িত্বে কোনও প্রভাব ফেলে না। এটি প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা নয়। প্রস্তাব পাশ হলেও শুধু চেয়ার হারাবেন স্পিকার— সরকার বহাল থাকবে। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনও লোকসভা স্পিকারকে এই পদ্ধতিতে অপসারণ করা হয়নি। অর্থাৎ, এই ঘটনা নিজেই এক ঐতিহাসিক সাংবিধানিক দৃষ্টান্তের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে দেশকে।
সংবিধানের ৯৪ ও ৯৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে স্পিকারকে অপসারণ করা যায়— তবে শর্ত হল, আগাম ১৪ দিনের নোটিস থাকতে হবে। স্পিকারের মেয়াদ লোকসভার মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত— ৫ বছর। কিন্তু সংসদ চাইলে মাঝপথেই তাঁকে সরাতে পারে। এছাড়া, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act, 1951) অনুযায়ী যদি স্পিকার সাংসদ থাকার যোগ্যতা হারান, তাহলেও তিনি পদচ্যুত হতে পারেন। অথবা তিনি নিজে চাইলে পদত্যাগও করতে পারেন।এ পর্যন্ত একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন নীলম সঞ্জীব রেড্ডি (Dr Neelam Sanjiva Reddy)— যিনি স্বেচ্ছায় স্পিকার পদ ছেড়েছিলেন এবং পরে ভারতের রাষ্ট্রপতিও হন।
এই অনাস্থা প্রস্তাব বাস্তবে পাশ হবে কি না, সেটা মুখ্য প্রশ্ন নয়। আসল তাৎপর্য অন্য জায়গায়। বিরোধীরা সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতর থেকেই স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অর্থাৎ, এটি কেবল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং সংসদের নৈতিক কাঠামো নিয়েই এক রাজনৈতিক বিতর্ক। স্পিকার হলেন সংসদের রেফারি— যাঁর কাজ খেলার নিয়ম মানানো, কোনও দলের হয়ে খেলতে নামা নয়। সেই রেফারিকেই যদি খেলোয়াড়রা পক্ষপাতী বলে অভিযুক্ত করে, তাহলে সেটি সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য গভীর অস্বস্তিকর বার্তা।