অরিজিৎ সিং ও অনুষ্কা শঙ্করের কণ্ঠ ও সেতারের যুগলবন্দিতে বুঁদ হয়ে রয়েছে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় রাগাশ্রিত ঠুমরি ও গজলের সেতুবন্ধনে তৈরি এ গানের বোদ্ধা ও অবোদ্ধা সব ধরনের শ্রোতা। যদিও গানের গীতিকার, সুরকার এমনকী মূল শিল্পীর কেউই আর জীবিত নেই, তবুও অরিজিৎ ও অনুষ্কা কলকাতার নেতাজি ইনডোরের মঞ্চে কেন এই গানটিকেই বেছে নিলেন শ্রোতাদের মোহিত করতে।

মূল কণ্ঠশিল্পী ছিলেন অনুষ্কার জেঠিমা তথা বাংলার পুত্রবধূ লক্ষ্মীশঙ্কর। যিনি আদতে তামিল ব্রাহ্মণ শাস্ত্রী পরিবারের মেয়ে।
শেষ আপডেট: 9 February 2026 17:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘মায়াভরা রাতি সাথীহারা চলে যায়, কেন এলে না’। এর আগে কেউ কোনওদিন শুনেছেন এরকম গান! রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে সকলেই বলবেন, ‘হ্যাঁ, শুনেছি তো! অরিজিৎ সিংই তো এই গান গেয়ে ফাটিয়ে দিয়েছে। কী গেয়েছে অরিজিৎ!’ কারণ আপাতত অরিজিৎ সিং ও অনুষ্কা শঙ্করের কণ্ঠ ও সেতারের যুগলবন্দিতে বুঁদ হয়ে রয়েছে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় রাগাশ্রিত ঠুমরি ও গজলের সেতুবন্ধনে তৈরি এ গানের বোদ্ধা ও অবোদ্ধা সব ধরনের শ্রোতা। যদিও গানের গীতিকার, সুরকার এমনকী মূল শিল্পীর কেউই আর জীবিত নেই, তবুও অরিজিৎ ও অনুষ্কা কলকাতার নেতাজি ইনডোরের মঞ্চে কেন এই গানটিকেই বেছে নিলেন শ্রোতাদের মোহিত করতে। যেখানে গানটি লেখা, সুর ও প্রথম রেকর্ডিং হয়েছে, চলতি প্রজন্মের বেশিরভাগেরই পিতামাতার জন্মেরও আগে। বিশেষত গানটি বিশুদ্ধ ধ্রুপদী ঘরানার, তাই এটি সেই সময়েরও খুব জনপ্রিয় গান ছিল না। আসলে এই গানের সঙ্গে কলকাতার রক্তের সম্পর্ক। আর অনুষ্কার পূর্বজদের সুর ও কণ্ঠের জাদু। এই গানের কথা লিখেছেন সুবিখ্যাত বাঙালি গীতিকার শ্যামল গুপ্ত (সঙ্গীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী), সুরকার অনুষ্কার বাবা পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ও মূল কণ্ঠশিল্পী ছিলেন অনুষ্কার জেঠিমা তথা বাংলার পুত্রবধূ লক্ষ্মীশঙ্কর। যিনি আদতে তামিল ব্রাহ্মণ শাস্ত্রী পরিবারের মেয়ে।
রবিবার অনুষ্কা শঙ্করের কনসার্টে অতিথি শিল্পী হিসেবে হাজির ছিলেন অরিজিৎ সিং। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতির কথা আগে কেউ ঘোষণা করেননি। মঞ্চে হঠাৎ করেই হাজির হন অরিজিৎ। মঞ্চে উঠে খানিকটা ইতস্তত অরিজিৎ। তিনি বলেন, "এই মুহূর্তে আমি খুব নার্ভাস...আর আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।" অনুষ্ঠান শেষে অনুষ্কাশঙ্কর ইনস্টাগ্রামে এই সন্ধ্যার কিছু মুহূর্ত শেয়ার করে লেখেন, অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু এটুকুই—আমার হৃদয় ভরে যাচ্ছে!!!! বাবার খুব কম শোনা একটি বাংলা গানকে জীবন্ত করে তোলা, আর তারপর কলকাতার সঙ্গে আমাদের নতুন সঙ্গীত ভাগ করে নেওয়া— একমাত্র @arijitsingh-এর কণ্ঠে— আমার কাছে সত্যিই এক অনন্য, স্মরণীয় অনুভূতি। বইয়ের পাতায় তুলে রাখার মতো একটি মুহূর্ত।
সত্যিই এই গানটি খুব কম মানুষই এ পর্যন্ত শুনেছিলেন। গানটির প্রথম প্রকাশ ১৯৬০ সালের ১ জুন। ৩ মিনিট ৮ সেকেন্ডের এই গানটিতে রয়েছে শুদ্ধ গজল ঘরানা, যাকে ফেলা হয়েছে হিন্দুস্থানি ঠুমরির ছাঁচে। বিরহী প্রেমিকার মনোবেদনা ও রাত্রিনিশীথে নৈঃসঙ্গের কাতর কান্না এই গানের কথার বিষয়বস্তু। উল্লেখ্য, গানটি গাইতে গিয়ে অরিজিৎ একটি কথা ভুল বলে ফেললেও তার জন্য বিরাট কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়নি। আর লক্ষ্মীশঙ্করের মূল গানটি দেওর রবিশঙ্করের সুরারোপিত হলেও তাতে সেতারের ঝঙ্কার ছিল না। অর্গান বা পিয়ানো, বেহালা, বাঁশি, তবলার ব্যবহার ছিল। কিন্তু এদিনে অনুষ্ঠানে অরিজিতের সঙ্গে সঙ্গত দিয়েছেন রবিকন্যা অনুষ্কা। যা নতুন ঘরানায় পরিবেশিত হয়েছে।
২০০৯ সালে, প্রখ্যাত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী লক্ষ্মীশঙ্কর ৮৩ বছর বয়সে গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন ‘বেস্ট ট্র্যাডিশনাল ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যালবাম’ বিভাগে। অনেকেই তাঁকে চেনেন অস্কারজয়ী ছবি ‘গান্ধী’র সাউন্ডট্র্যাকে বৈষ্ণব জন কো গানের মেলোডি কণ্ঠ হিসেবে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, শৈশবে তিনি নিজে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন। দশকের পর দশক ধরে ভারত ও ভারতীয়-আমেরিকান সমাজে লক্ষ্মীজিকে নানা রূপে দেখা গেছে। প্রথমে তাঁকে দেখা যায় উদয়শঙ্করের যুগান্তকারী ভারতীয় নৃত্যদলের কিশোরী নৃত্যশিল্পী হিসেবে। পরে তিনি বলিউড ও তামিল চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি খ্যাতি অর্জন করেন একজন অসাধারণ হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে।
১৯২৬ সালে এক গান্ধীবাদী তামিল পরিবারে জন্ম লক্ষ্মীর। সেই সময়ে অধিকাংশ মেয়ের যেখানে নাচ শেখা বিরল ঘটনা, সেখানে তিনি খুব ছোট বয়সেই নৃত্যচর্চা শুরু করেন। তাঁর মা বিশ্বলক্ষ্মীও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চেন্নাইয়ে বিখ্যাত ভরতনাট্যম শিল্পী বালাসরস্বতীর অনুষ্ঠান নিয়মিত দেখতেন। মেয়ের প্রতিভা দেখে তিনি লক্ষ্মীকে পাঠান বালাসরস্বতীর গুরু কিংবদন্তি কন্দাপ্পান পিল্লাইয়ের কাছে। পরে লক্ষ্মী অডিশন দেন উদয়শঙ্করের আলমোড়ার নৃত্য আকাদেমিতে। সেই সময় একজন দক্ষিণ ভারতীয় ব্রাহ্মণ মেয়ের নাচ শেখাই ছিল সামাজিকভাবে অস্বাভাবিক, আর দেশের অন্য প্রান্তে গিয়ে নৃত্যদলে যোগ দেওয়া ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
হিমালয়ের পাদদেশে লক্ষ্মী শেখেন উদয়শঙ্কর স্টাইল— যেখানে নানা শাস্ত্রীয় নৃত্যরীতিকে একত্র করে গড়ে তোলা হয়েছিল নাচের নতুন এক ভাষা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি উজরা ও জোহরা সেহগাল এবং অমলাশঙ্করের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন। ১৫ বছর বয়সে উদয়শঙ্করের ভাই রাজেন্দ্রশঙ্কর তাঁর জন্য বিবাহপ্রস্তাব পাঠান। রাজেন্দ্র ছিলেন তাঁর থেকে ২১ বছরের বড়। অল্প আয়োজনের মধ্যেই লক্ষ্মীর বিয়ে হয় শঙ্কর পরিবারে। পরবর্তী দুই বছর তিনি নৃত্যদলের সঙ্গে দেশবিদেশে সফর করেন এবং একাধিক প্রযোজনায় অভিনয় করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে পাশ্চাত্য অনুদান বন্ধ হয়ে গেলে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে লক্ষ্মী চলে আসেন মুম্বইয়ে, চলচ্চিত্রে কাজের আশায়। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে যোগ দেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, তাঁর স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী ও ছেলে শুভেন্দ্র।
লক্ষ্মী অভিনয় করেন তামিল ছবি ‘ভক্ত তুলসীদাস’ (১৯৪৭)-এ, কিন্তু তেমন কাজ আর পাননি। এরপর তিনি প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। সুরকার মদন মোহনের সঙ্গে কাজ করেন এবং কে. এ. আব্বাসের ‘ধরতি কে লাল’ ও চেতন আনন্দের ‘নীচা নগর’ ছবিতে গান করেন।

একসময় অসুস্থতার কারণে তিনি নাচ পুরোপুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তখন মদন মোহন তাঁকে পাটিয়ালা ঘরানার উস্তাদ রহমত আলি খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফলে এক তামিলভাষী ভরতনাট্যম শিল্পী ও কর্ণাটকী সঙ্গীতশিল্পী ধীরে ধীরে শেখা শুরু করেন হিন্দুস্থানি সঙ্গীত। শুরু হয় নতুন অধ্যায়— ছোট ছোট কনসার্ট, ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা।
১৯৭৪ সালে তিনি রবিশঙ্কর ও বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মার্কিন সফরের শেষ দিনে গেয়েছিলেন হিন্দুস্থানি পপ গান ‘আই অ্যাম মিসিং ইউ’। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ২০১৩ সালে ৮৭ বছর বয়সে লক্ষ্মীশঙ্করের মৃত্যু হয়। এক অসাধারণ জীবন, যার গভীরতা ও বৈচিত্র্য হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্টভাবে চিনবে বিশ্ব।
ফলে অরিজিৎ ও অনুষ্কার দ্বৈত অনুষ্ঠানে লক্ষ্মীশঙ্কর ফের নতুন করে বেঁচে উঠলেন দেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে। আর একই সঙ্গে ‘বাতায়নে দীপ নিভে গেল জ্বলে...ছলছল চোখে চাঁদ কী যে বলে যায়, শুনে গেলে না’ (মূল কথা)। এর মধ্য দিয়েই অরিজিৎও তাঁর হিন্দি ছবিতে গানের মঞ্চ থেকে বিদায়ের শেষরাতের রাগিণীর মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে দিয়ে গেলেন ইনডোরে।