কী করে ঘর মুছতে হয় জানো তুমি? উত্তর, হ্যাঁ, জানি। থালাবাসন মাজতে পারো? এরপরেও সংক্ষিপ্ত জবাব, হ্যাঁ। তুমি কি দেওয়ালে ঘুঁটে দিতে পারবে?

তামাম বাঙালি মাধবী মুখোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের চিলেকোঠাতেই বেঁধে রেখেছেন।
শেষ আপডেট: 10 February 2026 14:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কী করে ঘর মুছতে হয় জানো তুমি? উত্তর, হ্যাঁ, জানি। থালাবাসন মাজতে পারো? এরপরেও সংক্ষিপ্ত জবাব, হ্যাঁ। তুমি কি দেওয়ালে ঘুঁটে দিতে পারবে? এবারে ইন্টারভিউ দিতে আসা তরুণী পড়লেন দ্বিধায়। খানিকটা লজ্জাতেও। এ আবার কেমনতরো ইন্টারভিউ! তরুণী ভয়ে ভয়ে মুখ করে বললেন, এর আগে কখনও ঘুঁটে দিইনি। কারণ সত্যিই তিনি এরকম কাজ করেননি কোনওদিন। এমন সময় ইন্টারভিউ দিতে আসা তরুণীকে মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করলেন যিনি, তাঁর নাম গীতা সেন। সহজে বললে, প্রখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেনের স্ত্রী, সহকারী ও অভিনেত্রী। আর মুখোমুখি ইন্টারভিউ নিচ্ছেন যিনি, তাঁর নাম মৃণাল সেন। মৃগয়া, ভুবন সোম, কলকাতা ৭১, আকালের সন্ধানে, খন্ডহর প্রভৃতি দেশ-বিদেশ কাঁপানো ছবির পরিচালক। আসল সত্যিটা হচ্ছে, ইন্টারভিউ যিনি দিচ্ছেন তাঁর নাম মাধবী মুখোপাধ্যায়। সেই সময় তেমন একটা নাম কেউ না জানলেও পরবর্তীতে প্রায় সাত দশকের বেশি সময় ধরে যিনি বাংলা ছায়াছবিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। সেই মাধবী মুখোপাধ্যায়ের আজ, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, জন্মদিন। বয়স গড়াল ৮৫ পেরিয়ে ৮৬-তে। সিনেমায় অভিনয় জীবন শুরু মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে, সেই ১৯৫০ সালে।
গীতা সেন তখন বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, কী প্রশ্নের ছিরি! সবাই কি এসব করতে পারে! এমনও নয় যে, ছবিতে এরকম কোনও দৃশ্য রয়েছে। Madhabi’s Garden – A Memoir, Madhabi Mukherjee নামের আত্মকথা ধরনের গ্রন্থে মাধবী নিজেই বলেছেন, সাক্ষাৎকারের পর আমি বাড়ি ফিরে আসি। মৃণালবাবু পরে আমাকে বলেছিলেন, তাঁর বাড়ির কিশোর কাজের লোকটি নাকি আমি বেরিয়ে আসার পর তাঁকে বলেছিল, ওনার মুখটা দেখেই বোঝা গিয়েছিল, আপনাকে ওকে কাজে নিতেই হবে।

অরুণাভ সিংহ অনূদিত ইংরেজি গ্রন্থটির মূল বাংলা আত্মজীবনীটির নাম ‘মাধবী কানন’। যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সেখানে মাধবী লিখেছেন, আমার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি, যেটিতে আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রর সঙ্গে কাজ করি, তার নাম ছিল কঙ্কনতলা লাইট রেলওয়ে। তার পর এল সেতু— এই ছবিতে ধীরাজ ভট্টাচার্য দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, আর নায়িকা ছিলেন চন্দ্রাবতী দেবী। আরও কয়েকটি ছবির কথা মনে পড়ে— যেমন অসবর্ণ ও বলয়গ্রাস, দু’টিই পরিচালনা করেছিলেন পিনাকী মুখোপাধ্যায়। বলয়গ্রাস-এ শিখারানি বাগ অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেনের মেয়ের চরিত্রে, আর আমি ছিলাম সেই মেয়ের বান্ধবী।
আর তারপর এল বাইশে শ্রাবণ। এই ছবির সঙ্গে আমার যোগটা তৈরি হয়েছিল একেবারে অদ্ভুতভাবে। বিজয় চট্টোপাধ্যায় ও ভোলানাথ রায় ছিলেন এই ছবির ডিস্ট্রিবিউটর ও প্রযোজক। তাঁরা দু’জনই ধানবাদে থাকতেন, আর সেখানে আমরা একসময় মঞ্চে উল্কা নাটকে একসঙ্গে অভিনয় করেছিলাম। আমি তাঁদের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁরা আমাকে ভোলেননি। তাঁরাই মৃণালবাবুকে আমার কথা বলেন। এরপর মৃণালবাবু অনুপকুমারকে বলেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। অনুপকুমার গীতা দে-র কাছ থেকে আমার ঠিকানা সংগ্রহ করেন। তারপর প্রোডাকশন টিমের একজন এসে আমাকে জানায়, মৃণালবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। তখন তিনি থাকতেন মনোহরপুকুর রোডে। আমি তাঁর বাড়িতে গেলাম, আর সেখানেই তিনি আমার ইন্টারভিউ নিলেন।

বাইশে শ্রাবণ করার সময়ই আমার জীবনে আরও একটি বড় ঘটনা ঘটে। আমার নাম বদলে যায়। জন্মের পর বাবা-মা আমার নাম রেখেছিলেন মাধুরী। এতদিন পর্যন্ত অভিনেত্রী হিসেবেও আমি সেই নামেই পরিচিত ছিলাম। কিন্তু বিজয় চট্টোপাধ্যায় একদিন বললেন,
আপনার নামটা একটু বদলালে আপত্তি আছে? মাধুরীর বদলে মাধবী হলে কেমন হয়? তাহলে আপনাকে নতুন মুখ হিসেবে তুলে ধরা যাবে, লিখেছেন উত্তম কুমারের সহ অভিনেত্রী ছদ্মবেশীর নায়িকা।
মাধবীর লেখায়, আমিও একটু ভেবে দেখলাম—আমার নামটা বড়, না আমার পরিবারের বেঁচে থাকাটা বড়? অনেকেই পরে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, আমার কি খারাপ লাগেনি? অবশ্যই লেগেছিল। কিন্তু হতাশার চেয়েও বড় ছিল কাজ পাওয়ার তাগিদ, বেঁচে থাকার প্রয়োজন। যে মাসিক পারিশ্রমিকের কথা বলা হয়েছিল, তাতে সংসারটা অন্তত চলবে। এই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই দিন থেকেই মাধুরী হারিয়ে গেল, আমি হয়ে গেলাম মাধবী।
বাইশে শ্রাবণ-এর বেশির ভাগ শুটিংই হয়েছিল আউটডোরে। স্টুডিওতে কাজ ছিল খুব কম। একদিন লোকেশন নিয়ে বিজয়বাবুকে জিজ্ঞেস করায় তিনি হেসে বললেন, রবীন্দ্রনাথ পড়নি? জীবন আমার নাম, মানকর আমার বাড়ি। সেই জায়গাই তো। বর্ধমান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে মানকর। মানকর তখন ছিল এক প্রাচীন গ্রাম। সময়ের ভারে বেশির ভাগ বাড়িই জরাজীর্ণ, ক্লান্ত, ধসে পড়ার মুখে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল একটি দোতলা বাড়িতে। ভিতরের ঘরগুলো আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। একটিতে থাকতেন মৃণালবাবু, ক্যামেরাম্যান পলদা, তাঁর সহকারী সত্যবাবু এবং শিল্প নির্দেশক বাণী চন্দ্রগুপ্ত— যাঁর আলাদা করে পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই।

আরেকটি ঘর, সঙ্গে একটা বারান্দা— সেটি দেওয়া হয়েছিল হিমাঙ্গিনী দেবী ও আমাকে। হিমাঙ্গিনী দেবী আমার শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী নিভাননী দেবীর দিদি। আলাদা কোনও বাথরুম ছিল না, বারান্দা ঢেকে স্নান সারতে হত। হিমাঙ্গিনী দেবীর শুট শেষ হলে তিনি কলকাতায় ফিরে যান। আমি একা ঘুমোতে ভয় পাব— এই ভেবে মৃণালবাবু আমার খাটের পাশে মেঝেতে শুয়ে পড়তেন। এইভাবেই তিনি আমার যত্ন নিতেন। আমাকে তিনি ডাকতেন ‘মালতী’ বলে। যে চরিত্রটা আমি করছিলাম তার নাম। ভোর হলেই ডাক দিতেন,
“মালতী!”
আমি লাফিয়ে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে যেতাম। কখনও কখনও গীতা-দিদি তাঁদের ছেলেকে নিয়ে আসতেন। তিনি মৃণালবাবুর বিছানার চাদর-বালিশ বদলে দিতেন। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে তাঁরা মুখে কথা বলতেন না, ছোট ছোট কাগজে লিখে লিখে কথা চালাতেন।
বাইশে শ্রাবণ-এর সেট বানিয়েছিলেন বাণী চন্দ্রগুপ্ত। কাঁচা মাটির দেওয়ালওয়ালা কুঁড়েঘরটি ছিল একেবারে নিখুঁত। শুধু একটি বিষয়ে বাণীবাবুর সমস্যা ছিল— তিনি ‘কুলুঙ্গি’কে বলতেন ‘কুলাঙ্গি’। সারাদিন শুটিং করে সন্ধেবেলা আমরা একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে হাঁটতে বেরতাম। লোককথায় ছিল, মারাঠা আক্রমণকারীরা একসময় মানকর দিয়ে গিয়েছিল, আর তাদের ক্যাম্পের কিছু ধ্বংসাবশেষ নাকি এখনও আছে। সেদিকেই আমরা হাঁটতে যেতাম। জ্ঞানেশবাবু খুব জোরে গান ধরতেন, আমরা কয়েকজন সঙ্গ দিতাম।
একদিন সন্ধ্যা নামার পর ফেরার পথে হঠাৎ বাণীবাবু তাঁর বিশেষ ফিসফিসে স্বরে বললেন, স্নেক, স্নেক। আমরা সবাই ভয়ে দৌড়ে পালালাম। অনেক দূরে এসে মৃণালবাবু বললেন, “থামো, দেখা যাক সত্যিই সাপ ছিল কি না।” জ্ঞানেশবাবুও দেখতে চাইছিলেন। আমি আর কী করি? একা থাকার সাহস আমার ছিল না। তাই বাণীবাবুর হাত শক্ত করে ধরে আমিও ফিরে গেলাম। জ্ঞানেশবাবু দেখালেন, ওটা আসলে মাটিতে পড়ে থাকা একটা শুকনো ডাল। তখন মৃণালবাবু তাঁর চিরচেনা রসবোধে নানা কথা বলতে শুরু করলেন। তবে সত্যি কথা বলতে, ওই এলাকায় সাপের উপদ্রব ছিলই। আর পোকামাকড়েরও।

আমাদের থাকার বাড়িতে কারেন্ট ছিল না। রাতের খাবার খেতাম কেরোসিনের লণ্ঠনের আলোয়। চারদিকে উড়ে বেড়ানো পোকামাকড় এড়িয়ে খাবার খাওয়া ছিল একেবারে বিভীষিকার মতো। আমরা মৃণালবাবুর সহকারী ইন্দর সেনকে ডাকতাম ‘চান্দু’ বলে। একদিন আমি বললাম,
“এত পোকামাকড়ের মধ্যে কী করে খাব, চান্দু?”
সে হেসে বলল,
“ওগুলোও খেয়ে নিন, ফ্রি প্রোটিন!”
মাধবীর বাবা ছিলেন আইনজীবী শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং মা লীলা মুখোপাধ্যায় ছিলেন অভিনেত্রী। ১৯৪০ সালে মাধুরীর জন্মের পর তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তখন বড় মেয়ে মঞ্জরী ও ছোট মেয়ে মাধুরীকে নিয়ে লীলাদেবী কলকাতায় চলে আসেন। কিশোরী বয়সের আগেই মাধুরী যোগ দেন বাংলা নাট্যমঞ্চে। অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী হিসেবে শিশির ভাদুড়ী, অহীন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী ও ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে। শিশুশিল্পী হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্রর দুই বেয়াই সিনেমায় আত্মপ্রকাশ মাধবীর।
বাঙালির চিরকেলে স্বভাব হচ্ছে, অস্কার, গ্র্যামি ও নোবেল না পেলে কেউ শিল্প-সাহিত্যের শিকেয় উঠে বসতে পারেন না। তাই তামাম বাঙালি মাধবী মুখোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের চিলেকোঠাতেই বেঁধে রেখেছেন। সত্যজিতের সঙ্গে মাত্র গুটিকতক ছবিতে অভিনয় ছাড়াও বাংলার সমস্ত প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে অগুনতি হিট ছবি, ভাল ছবি করেছেন তিনি। সুচিত্রা সেনের মতো রূপ, সুপ্রিয়া দেবীর মতো আবেদনময়ী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জোরাল অভিনয়ক্ষমতা, অপর্ণা সেনের ছিপছিপে শরীরী বিভঙ্গ সবকিছু এক জায়গায় মেলালে যে রূপ ভেসে ওঠে, তাঁর নাম মাধবী। যার রূপ-রস-গন্ধ-মাধুর্যে সাত দশক ধরে কুপোকাত হয়ে ছিল বাঙালি দর্শক।