তৃণমূলের ওই নেতার কথায়, “বয়স বাড়া অপরাধ নয়। কিন্তু মাঠে না নামলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। মানুষের দরজায় যিনি পৌঁছন, তাকেই মানুষ ভোটে মনে রাখে।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 18 October 2025 13:56
লোকসভা ভোটের সময়ে তৃণমূলে বয়স বিতর্ক (age debate in TMC) ছিল জমজমাট। ৭০ বছর বয়স পেরিয়ে গেলে তাঁদের আর টিকিট দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। অভিষেকের মত ছিল, বিধায়ক বা সাংসদরা জনপ্রতিনিধি। কারও বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলে তাঁদের অনেকেরই কর্মক্ষমতা থাকে না। তা ছাড়া বিধায়ক বা সাংসদ পদে থেকে যাওয়াটাই তো মোক্ষ নয়। সংগঠনের জন্য কাজও করা যায়। তা সত্ত্বেও শেষমেশ সৌগত রায় ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তবে অভিষেক ছিলেন তাঁর মতে ও অবস্থানে অনড়। তাই বাংলার ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৪০টিতেই প্রচার করলেও সৌগত ও সুদীপের নির্বাচন কেন্দ্র দমদম ও উত্তর কলকাতায় প্রচার করেননি অভিষেক।
সৌগত-সুদীপ দু’জনেই জিতেছেন। কিন্তু ঘটনা হল, এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা যাচ্ছে, দুজনেই বেশ অসুস্থ। নিজেদের নির্বাচন কেন্দ্র তো দূর, আগের মতো সংসদের অধিবেশনেও যোগ দিতে পারছেন না। অর্থাৎ প্রকারান্তরে অভিষেকের বক্তব্যই এতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এবং ছাব্বিশের ভোটের আগে ফের সেই প্রশ্ন সজীব হয়ে উঠেছে যে, বর্তমান বিধায়কদের মধ্যে যাঁদের ৭০ পেরিয়েছে, তাঁরা কি ফের টিকিট পাবেন, নাকি পাবেন না!
কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, কোনও রকম ব্ল্যাঙ্কেট ব্যানের কথা ভাবা হচ্ছে না। অর্থাৎ কারও বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেই তিনি টিকিট পাবেন না এমন নয়। যেমন, ধরা যাক বজবজের বিধায়ক অশোক দেব। হিসাব মতো তাঁর বয়স ৭৬। কিন্তু এখনও নিয়ম করে রোজ উদয়াস্ত নিজের নির্বাচন কেন্দ্রে পড়ে থাকেন। কোনও অঘটন না ঘটলে, পুনরায় তাঁর টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা।
আবার এমন বিধায়কও দলে রয়েছে যাঁর বয়স ৪৫ বা ৫০ হলেও এতটা সক্রিয় নন। বিধানসভা এলাকায় তাঁকে পাওয়া যায় না বা কদাচিত পাওয়া যায়। তাই এক প্রকার ‘অ্যাক্টিভিটি অডিট’ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, কে কতটা সক্রিয়, মাঠে কাজ করছেন কি না, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কি না, সবই দেখা হচ্ছে খুঁটিনাটি ভাবে। গত পাঁচ বছরে সংগঠনে অংশগ্রহণ, বিধানসভা এলাকায় কাজের নজির— সবকিছুরই হিসেব রাখা হচ্ছে।
ছাব্বিশের জন্য তৃণমূলের প্রার্থী বাছাইয়ের একটা প্রাথমিক সমীক্ষা মাস খানেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। সেটা সমীক্ষাই মাত্র। অর্থাৎ গ্রাউন্ড রিপোর্ট নেওয়া। সত্তরোর্ধ্ব বিধায়কদের একটি তালিকাও তৈরি হয়েছে। তাঁদের অডিটও চলছে বলেই খবর।
বর্তমানে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ২১৫। এর সঙ্গে দলবদল করে যোগ দেওয়া আরও ৬ বিধায়ককে ধরলে সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ২২১। এর মধ্যে যাঁদের বয়স ৭০ ছুঁয়েছে বা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে হবে, এমন ৫৭ জন রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এই ৫৭ জনের মধ্যে রয়েছেন ১৬ জন মন্ত্রী। রয়েছেন ৬ জন মহিলা বিধায়ক এবং ৪ জন বিধায়ক যাঁরা পেশায় চিকিৎসক।
জেলা অনুযায়ী দেখলে, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি, ১১ জন বিধায়ক ৭০ বা তার বেশি বয়সের। উত্তর ২৪ পরগনায় ৬ জন, পূর্ব বর্ধমানে ৫ জন, নদীয়ায় ৫ জন এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ৪ জন আছেন সেই তালিকায়।
তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “রাজনীতির আসল শক্তি মানুষের সঙ্গে সংযোগে। যাঁরা নিয়মিত মাঠে নামছেন, মানুষের পাশে থাকছেন, তাঁরাই দলের সম্পদ। বয়স বা পদ নয়, এখন কাজটাই বড় কথা। যেখানে বিধায়ক তাঁর এলাকার মানুষের সঙ্গে জুড়ে নেই সেখানে স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা”।
তৃণমূলের ওই নেতার কথায়, “বয়স বাড়া অপরাধ নয়। কিন্তু মাঠে না নামলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। মানুষের দরজায় যিনি পৌঁছন, তাকেই মানুষ ভোটে মনে রাখে।”
অতএব, ২০২৬-এর ভোটের আগে শাসক শিবিরে স্পষ্ট বার্তা, বয়স নয়, কাজই এখন টিকিটের মাপকাঠি। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় তাই এখন সবার নজর- এই ৫৭ জন সত্তরোর্ধ্ব বিধায়কের মধ্যে কারা থাকবেন মাঠে, আর কাদের ধরানো হবে রেডকার্ড!