মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় ভোট ঘোষণা হওয়ার কথা, তার আগে হঠাৎ রাজ্যপাল পদ থেকে আনন্দ বোসের ইস্তফা ও রবি-র উদয় ইতিমধ্যে সন্দেহ জাগিয়েছে অনেকের মনে।

নরেন্দ্র মোদী, রবীন্দ্র নারায়ণ রবি ও অজিত ডোভাল
শেষ আপডেট: 6 March 2026 16:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসাবে আজ-কালের মধ্যে শপথ নেবেন তামিলনাড়ুর সদ্য প্রাক্তন রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি (R N Ravi)। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় ভোট ঘোষণা হওয়ার কথা, তার আগে হঠাৎ রাজ্যপাল পদ থেকে আনন্দ বোসের ইস্তফা ও রবি-র উদয় ইতিমধ্যে সন্দেহ জাগিয়েছে অনেকের মনে। এবং কৌতূহলের মোদ্দা বিষয় হল, বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা বা আশঙ্কার কথা ধরে নিয়েই কি একজন বজ্রকঠিন প্রাক্তন পুলিশ কর্তাকে রাজ্যপাল পদে নিয়োগ করা হল?
সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করা এখনই সহজ নয়। তবে এ টুকু স্পষ্ট যে আনন্দ বোসের বিদায়ে এবং রবির আগমনে বিজেপি শিবির খুশি। বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কারণ, বোস জমানায় রাজভবন ‘জীবাষ্মে’ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি অনেক দিন ধরেই তাঁকে অপসারণের জন্য দরবার করছিলেন দিল্লিতে।
এখন জানার বিষয়, কে এই রবীন্দ্র নারায়ণ রবি? কেন তাঁকে নিয়ে দ্রাবিড়ভূমি তামিলনাড়ুতে এতদিন এতো আলোচনা ছিল!
আর এন রবি ছিলেন ১৯৭৬ ব্যাচের দক্ষ আইপিএস অফিসার। কতটা দক্ষ অফিসার ছিলেন তা কিছুটা ব্যাখ্যা করলেই স্পষ্ট বোঝা যাবে। ৯০-এর দশক থেকেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী তথা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে(IB) কর্মরত ছিলেন রবি। একজন পুলিশ কর্তা থেকে ক্রমশ গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্র নারায়ণ। সেই সময়ের সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র এবং সহজ মানুষ।
তখন কাশ্মীর জুড়ে জঙ্গি বিদ্রোহের সময়ে আইবির যে বিশেষ ‘কে-গ্রুপ’ কাশ্মীর অপারেশন সামলাত, রবি ছিলেন সেই দলের সদস্য। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন এ এস দুলাত—যিনি পরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হন। সেই সময়ে শ্রীনগরেও আইবির হয়ে কাজ করেছিলেন রবি। তখন তাঁর মধ্যে কোনও কট্টর ডানপন্থী ভাবধারা দেখা যেত না বলেই অনেকেই মনে করেন। পরে তাঁকে উত্তর–পূর্ব ভারতের দায়িত্বে থাকা আইবির একটি দলে পাঠানো হয়। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ভবিষ্যতের আইবি চিফ পি সি হালদার।
২০১২-১৩ সালে আবার রবির নাম সামনে আসে। ভারত- পাক সিনিয়র গোয়েন্দা কর্তাদের ‘ট্র্যাক টু’ বৈঠকের অন্যতম চরিত্র ছিলেন রবি। এ ধরনের বৈঠকের কোনও সরকারি স্বীকৃতি থাকে না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নীতি নির্ধারণে তা গুরুত্বপূর্ণ। তখন প্রাক্তন আইবি চিফ অজিত ডোভালও কয়েকটি ট্র্যাক টু মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
কিন্তু ২০১৩ সালের দিকে যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে যে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে, তখন ডোভাল এই বৈঠকগুলিতে যাওয়া বন্ধ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই রবিও এই সব বৈঠক থেকে সরে দাঁড়ান।
নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অজিত ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) করা হয়। আর আর এন রবিকে নিয়োগ করা হয় জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে। পাশাপাশি তাঁকে নাগা শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনাকারী বা ইন্টারলোকিউটরও করা হয়। উত্তর–পূর্ব ভারতের বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে এই দায়িত্ব তাঁর উপরেই দেওয়া হয়েছিল।
২০১৫ সালে নাগা সংগঠনগুলির সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর ২০১৯ সালে তাঁকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল করা হয়। পরে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে তাঁকে পাঠানো হয় চেন্নাইয়ের রাজভবনে।
তবে তামিলনাড়ুতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর আচরণ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনেকেরই বিস্ময় তৈরি হয়। এমনকি তাঁর প্রাক্তন বস, আইবির দু’বারের প্রধান এম কে নারায়ণন নাকি একসময়ে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, “এই মানুষটার হল টা কী?” জানিয়ে রাখা ভাল, প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধানদের রাজভবনে নিয়োগের রীতি নতুন নয়। নারায়ণন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ আর এন রবিকে তামিলনাড়ুর ১৫তম রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করেন। শপথ নেওয়ার পর পরই রবি বলেছিলেন, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় রেখেই কাজ করবেন। তখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনও তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই রাজভবন ও তামিলনাড়ু সরকারের মধ্যে সংঘাতের শুরু হয়।
বিল আটকে বিতর্ক
তামিলনাড়ু বিধানসভায় পাস হওয়া একাধিক বিল দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন না দিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে রবির বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ২১টি বিল তিনি ঝুলিয়ে রাখেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে NEET পরীক্ষার বিরোধিতা করে আনা একটি বিলকে ঘিরে। তামিলনাড়ু সরকার চেয়েছিল দ্বাদশ শ্রেণির নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি হোক। কিন্তু সেই বিল অনুমোদন না করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেন রবি।
পরে তিনি বলেন, “কোনও বিল আটকে রাখা মানে শুধু অপেক্ষা করানো নয়, অনেক সময় সেটি কার্যত অকেজো হয়ে যায়।” এই মন্তব্যে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
বিধানসভায় নাটকীয় মুহূর্ত
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তামিলনাড়ু বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ ঘিরেও বড় বিতর্ক হয়। সাধারণত রাজ্যপালের ভাষণ সরকার প্রস্তুত করে দেয়। কিন্তু সেই ভাষণের কিছু অংশ তিনি পড়েননি বলে অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে সামাজিক ন্যায়, নারী অধিকার এবং পেরিয়ার বা বি আর আম্বেদকরের মতো নেতাদের উল্লেখ তিনি বাদ দেন বলে দাবি করে সরকার। এই নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিধানসভা থেকে বেরিয়েও যান রবি। এই ঘটনা দেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিতর্কে বড় আলোড়ন তোলে।
ভাষা ও শিক্ষা নীতি নিয়েও মতবিরোধ
জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) নিয়েও তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয়। রবি প্রকাশ্যে এই নীতিকে সমর্থন করেন এবং ছাত্রদের একাধিক ভারতীয় ভাষা শেখার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে তামিলনাড়ুর শাসক দল ডিএমকে মনে করে, তিন ভাষার নীতি কার্যত হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ফলে শিক্ষা নীতি নিয়েও রাজভবন ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।
‘তামিলনাড়ু’ না ‘তামিঝাগম’ বিতর্ক
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে রবি মন্তব্য করেন, “তামিলনাড়ু”র বদলে “তামিঝাগম” নামটি হয়তো বেশি উপযুক্ত। এই মন্তব্যে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ডিএমকে থেকে শুরু করে বিরোধী এআইএডিএমকে—সব দলই এই মন্তব্যের সমালোচনা করে। চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় ‘Get Out Ravi’ পোস্টারও দেখা যায়।
‘দ্রাবিড় মডেল’ নিয়ে কটাক্ষ
তামিলনাড়ুর শাসক দল যে ‘দ্রাবিড় মডেল’ শাসনের কথা বলে, সেটিকেও তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন রবি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এমন কোনও শাসন মডেল নেই। এটা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান।” এই মন্তব্যও তামিল রাজনীতিতে বিতর্কের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়।
নাগাল্যান্ডেও বিতর্ক
তামিলনাড়ুর আগে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন রবি। সেখানেও তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নাগা রাজনৈতিক সংগঠন এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচিত সরকারের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিল।
এবার কলকাতায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদ থেকে আনন্দ বোসের ইস্তফা ও রবিকে সেই পদে নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভোটের আগে কেন্দ্রের এই এক তরফা পদক্ষেপের নেপথ্যে রাজনৈতিক অভিসন্ধী থাকতে পারে বলেও তাঁর সন্দেহ। এখন দেখার রাজভবনে রবীন্দ্র নারায়ণ রবি কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বা কীভাবে নিজেকে ক্রমশ মেলে ধরেন!