গোলপার্ক-কাণ্ডে উঠে এসেছে ঢাকুরিয়া-কসবার আতঙ্ক সোনা পাপ্পুর নাম। শাসক দল ঘনিষ্ঠ এই দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে উঠছে এলাকা দখল, হামলা ও বেআইনি নির্মাণে মদতের অভিযোগ।

সোনা পাপ্পু (ফাইল ছবি)
শেষ আপডেট: 2 February 2026 13:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গোলপার্কের ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শহরে। গড়িয়াহাটের একদম কাছে এই জনবহুল এলাকায় ঠিক কী করে সন্ধেয় গুলি-বোমা চলল, তা ঠাওর করে উঠতে পারছেন না অনেকেই। একটু প্রশ্ন করলেই গড়গড়িয়ে ক্ষোভের কথা বলছেন স্থানীয়রা। উঠছে এলাকা দখল ও বস্তি দখল প্রসঙ্গ, বেআইনি নির্মাণ-সহ একাধিক বিষয়। নেপথ্যে সোনা পাপ্পু। কসবা, ঢাকুরিয়া আর রামলাল বাজার চত্বরে নাকি ত্রাস এখন সে-ই।
কাঁকুলিয়া রোডে তার সঙ্গেই গত সন্ধেয় ঝামেলা হয় স্থানীয় এক যুবকের। নির্দিষ্ট কারণ বলতে না পারলেও, স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, পাপ্পু চায় এখানকার লোকজনকে তুলে, সরিয়ে বেআইনি নির্মাণ করবে, তা করতে না পারায় অশান্তি শুরু। তাদের কথাতেই উঠে আসে, এই অশান্তি নতুন নয়। গত কয়েকমাস ধরেই কম-বেশি ঝামেলা চলছে। রুখে দাঁড়াতেই গতকাল এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোথা থেকে বোমা-গুলি এল, তা স্থানীয়রাও বুঝে উঠতে পারছেন না।
এখন সকলের একটাই প্রশ্ন, কে এই সোনা পাপ্পু? কীভাবেই বা এত দাপট? কার মদতে এলাকাজুড়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সে? সবকিছুর মাঝে উঠে আসছে শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ছবি।
দুই ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগের তির সোনা পাপ্পুর দিকে
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলকাতা পুরসভার ৬৭ নম্বর ও ৯১ নম্বর ওয়ার্ডে শাসকদলের হয়ে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণের কাজ করে সোনা পাপ্পু। এলাকায় তার প্রভাব এমনই যে, ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় (Baishwanar Chattopadhyay) রবিবার রাতে ঘটনাস্থল কাঁকুলিয়া রোডে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বলে অভিযোগ। যদিও ঘটনাস্থল পড়ে ৯০ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে—যার কাউন্সিলর বৈশ্বানরের স্ত্রী চৈতালি চট্টোপাধ্যায় (Chaitali Chattopadhyay)।
বাসিন্দাদের অভিযোগ আরও গুরুতর—বিগত পুরভোট হোক বা অন্য কোনও নির্বাচন, বিরোধীদের ‘ঘরবন্দি’ করতে সোনা পাপ্পুই নাকি শাসকদলের পছন্দের হাতিয়ার। মাত্র মাসখানেক আগে, পুরসভার বিল্ডিং বিভাগে ৫০–৫৫টি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ জমা পড়ে। প্রতিটি অভিযোগেই উঠে এসেছে সোনা পাপ্পুর নাম। স্থানীয়দের ক্ষোভ—বিল্ডিং বিভাগের ইঞ্জিনিয়াররাও নাকি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। কারণ? শাসক নেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা।
এর আগে ২০২২ সালে তার নাম কুখ্যাত দুষ্কৃতীদের তালিকায় জুড়ে জেলবন্দি করেছিল কলকাতা পুলিশ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বেরিয়ে আসে এবং আবার শুরু হয় প্রভাব-প্রতিপত্তি।
তিন গোষ্ঠীর দখলদারি লড়াই, বারুদে বসে কসবা বিধানসভা এলাকা
কসবা বিধানসভা জুড়ে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে তিনটি গোষ্ঠীর দাপট—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। তাই এলাকা চিরকাল যেন বারুদের উপর বসে। রবিবার রাতে কাঁকুলিয়া রোডে যা প্রকাশ্যে ফেটে পড়েছে বলে দাবি তাঁদের।
লক্ষ্য ছিল পঞ্চাননতলা বস্তি! বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘মাতব্বর’ দল
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই ঘটনার মূলে রয়েছে পঞ্চাননতলা বস্তি। বহুদিন ধরেই নাকি সেই বস্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন সোনা পাপ্পু। বস্তি উচ্ছেদ করিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত বাপি (Bapi) নামের স্থানীয় যুবককে কেন্দ্র করে। বর্তমানে বস্তির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই। বাসিন্দারাও বাপির কথাই শোনেন।
আর বাপির সঙ্গে যুক্ত কিছু মাতব্বর—যাঁরা শাসকদলেরই এক গোষ্ঠীর ছায়ায় রয়েছেন—তাঁরাই নাকি সোনা পাপ্পুর ‘গলার কাঁটা’। তাই বস্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তিনি ও তাঁর বাহিনী। আর তারপরই রবিবারের হামলা—এমনটাই দাবি এলাকার মানুষের।
শাসকদলের সঙ্গে ছবি ঘিরে নতুন বিতর্ক
সোনা পাপ্পুর সঙ্গে শাসকদলের একাধিক নেতার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কখনও কসবার বিধায়ক জাভেদ খান (Javed Khan), কখনও তৃণমূলের দক্ষিণ কলকাতার জেলা সভাপতি দেবাশিস কুমার (Debashis Kumar), কখনও আবার বৈশ্বানর-চৈতালির সঙ্গে পারিবারিক অনুষ্ঠানে এক ফ্রেমে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
যদিও ঘটনার পরে দেবাশিস কুমার জানিয়ে দেন অন্যায় করলে শাস্তি পাওয়া দরকার। গ্রেফতার হওয়া উচিত। পাশে ছবি থাকলেই শাস্তি এড়ানো যাবে, এমন নয়।
এই ঘটনায় আপাতত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। সিপি সুপ্রতিম সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এমন ঘটনায় কাউকে ছেড়ে কথা বলা হবে না।