আমলাতন্ত্রে সংস্কার, সালমা জুড়ুম-সহ একাধিক মাইলফলক মামলার শুনানিতে মেনকার বড় অবদান রয়েছে। সেদিক থেকে তাঁকে রাজ্যসভায় প্রার্থী হিসাবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটা বাস্তব দিক রয়েছে বলে কালীঘাট ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 28 February 2026 00:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুক্রবার রাতে যখন তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থী (TMC MP candidate list) তালিকা ঘোষণা করা হয়, দলের অনেকেই ঠাওর করতে পারেননি এই মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy) কে? রাজ্য রাজনীতিতে (West Bengal Politics) কখনও তো এর নাম শোনা যায়নি!
অনেকের কাছে যখন ব্যাপারটা ধোঁয়াশা তখন আবার কেউ কেউ একটা ঘটনার সঙ্গে মেনকার মনোয়ন মেলানোর চেষ্টা করছেন। অতীতে আরজি কর কাণ্ড (RG Kar case) হোক বা আই-প্যাক মামলা (IPAC case), কিংবা হালফিলের এসআইআর মামলা (SIR case), এই ক্ষুরধার আইনজীবী কখনও সরকার কখনও তৃণমূলের আইনজীবী হয়ে সওয়াল করেছেন। তাঁর সওয়ালের ধরন, আগ্রাসী স্বভাব নবান্নের চোদ্দ তলাকে বারে বারে মুগ্ধ করেছে। তা সে মামলায় ফল পাক বা না পাক। এবং এই পরম্পরারই সর্বশেষ অধ্যায় ছিল সম্প্রতি হাইকোর্টে আই প্যাক মামলার শুনানি।
দিনটা ছিল গত ১৪ জানুয়ারি। আই প্যাক মামলায় কলকাতা হাইকোর্টে তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবী হিসাবে সওয়াল করছিলেন মানেকা। ইডি তথা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) তরফে আইনজীবী ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু।
শুনানির সময়ে রাজু বেশ কয়েক বার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-কে নাম ধরে সম্মোধন করেন। কখনও বলেন, মিস মমতা বা কখনও কেবলই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তা নয়, মেনকার সওয়ালের সময়ে বার বার ফোড়নও কাটেন রাজু। এমন সময়েই কিছুটা আগ্রাসী ভঙ্গিমায় মেনকা গুরুস্বামী রাজুর উদ্দেশে বলেন, “এর পর আইনজীবী হিসেবে আদালতে বক্তব্য রাখার সময়ে, একজন বর্তমান মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে শুধু নাম ধরে সম্বোধন না করে তাঁর পদমর্যাদার সম্মান রাখুন। তিনি একজন বহুবার নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। আদালতে বক্তব্য রাখতে হলে একটি নির্দিষ্ট শালীনতা ও সৌজন্য বজায় রাখা প্রয়োজন, মি. রাজু”।
সরকার তথা আমলা মহলের অনেকেই মনে করছেন, ওই ফ্রেমটাই হয়তো মেনকাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
মেনকা সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী (Supreme court lawyer Menaka Guruswami)। আমলাতন্ত্রে সংস্কার, সালমা জুড়ুম-সহ একাধিক মাইলফলক মামলার শুনানিতে তাঁর বড় অবদান রয়েছে। সেদিক থেকে তাঁকে রাজ্যসভায় প্রার্থী হিসাবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটা বাস্তব দিক রয়েছে বলে কালীঘাট ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন।
তৃণমূলে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আইনজীবীরা রয়েছেন ঠিকই। তবে মেনকার উচ্চতা অন্যস্তরের। এর আগে একটা সময়ে কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি তৃণমূলের সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন। তার পর থেকে তেমন দুঁদে আইনজীবী তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবে নেই। এখন অভিষেক সিঙ্ঘভি বা কপিল সিবল্লের পরামর্শ নিতে গেলে রাজ্য সরকারকে মোটা ফি দিতে হয়। মেনকা হয়তো সেই শূণ্যস্থান পূরণ করতে পারেন।
মেনকা গুরুস্বামীর সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য হল ঔপনিবেশিক যুগের বিতর্কিত ৩৭৭ ধারা বাতিল—যে আইন পারস্পরিক ভাবে সম্মত সমলিঙ্গ সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করত। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা ১৫২৮টি বিচারবহির্ভূত হত্যার মামলাতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তিগত আইনচর্চায় তিনি দেওয়ানি আইন, বাণিজ্যিক আইন এবং হোয়াইট-কলার অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় সুপরিচিত।
আন্তর্জাতিক স্তরেও মেনকার অবদান স্বীকৃত। ২০১৯ সালে ফরেন পলিসি (Foreign Policy) পত্রিকার “১০০ জন প্রভাবশালী গ্লোবাল থিঙ্কার”-এর তালিকায় তিনি স্থান পান এবং একই বছরে অরুন্ধতী কাটজুর সঙ্গে টাইম ম্যাগাজিনের “১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের” তালিকায় উঠে আসেন।
রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। ইউনিসেফের (নিউ ইয়র্ক ও দক্ষিণ সুদান) উপদেষ্টা হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিষয়ে তাঁর পরামর্শ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নেপালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেও তিনি সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছেন।
গবেষণা ও লেখালেখিতেও ড. গুরুস্বামীর সমান স্বীকৃতি রয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে- ফাউন্ডিং মোমেন্টস ইন কনস্টিটুয়ালিজম (Founding Moments in Constitutionalism) প্রবন্ধসংকলনের সহ-সম্পাদনা এবং হ্যান্ডবুক অফ কনস্টিটিউশন মেকিং-এ (Handbook on Constitution-Making) (এডওয়ার্ড এলগার, ২০১৯) দক্ষিণ এশিয়ায় সংবিধান প্রণয়ন বিষয়ক প্রবন্ধ।
শিক্ষাজীবনে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড ল’ স্কুল এবং ন্যাশনাল ল স্কুলে পড়েছেন। অক্সফোর্ডে তিনি রোডস স্কলার এবং হার্ভার্ডে গ্যামন ফেলো ছিলেন। এছাড়াও ইয়েল ল স্কুল, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল-তে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে পড়িয়েছেন। তা ছাড়া ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কলম্বিয়া ল স্কুলে বি. আর. আম্বেদকর রিসার্চ স্কলার ও আইন বিভাগের প্রভাষক ছিলেন মানেকা।