উত্তর-পশ্চিম ভারতের দূষণ রুখতে ঝাড়খণ্ড-সংলগ্ন ৮০০ কিমি সীমান্তে সবুজ করিডর গড়ছে রাজ্য। দূষণ হ্রাসের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও বায়ো ফুয়েল শিল্পের সম্ভাবনা।

‘সার্বিক বর্জ্য সংশোধন ও পরিচালনা: চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ’ নিয়ে আলোচনা চক্র।
শেষ আপডেট: 25 February 2026 18:31
এ রাজ্যে (West Bengal) দূষণের (Pollution) দায় বহিরাগত বাতাসেরও (Cross-Border Air Pollution)। সে ক্ষেত্রে ত্রাতা হয়ে কিছুটা হলেও উঠে আসছে পশ্চিম সীমান্তের ‘সবুজ দেওয়াল’ (Green Corridor)। আর সেই পরিকল্পনার উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে তৈরি হচ্ছে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথও।
করোনা সংক্রমণের অতিমারি গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আমূল বদলে দেয় মানবসভ্যতার দিনযাপন। কিন্তু সেই অতিমারিই দক্ষিণবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতার দূষণের অন্যতম কারণের রহস্য উন্মোচন এবং তার সমাধানের চাবিকাঠি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে।
উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আসা বাতাসের সঙ্গে ভাসমান ধূলিকণার প্রবাহকে যতটা সম্ভব রোধ করতে ঝাড়খণ্ড-লাগোয়া রাজ্যের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার সীমান্তে সবুজ করিডর গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। মূলত গাছ লাগিয়ে একটি ‘সবুজ দেওয়াল’ তৈরি করা হচ্ছে। পর্ষদের আশা, আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হবে।
শুধু দূষণ হ্রাসই নয়, এই পরিকল্পনায় যুক্ত স্থানীয় গ্রামীণ বন পরিচালন গোষ্ঠীর (Forest Management Group) সদস্যরা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন। ফলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চক্রাকার অর্থনীতির (circular economy) ভিতও আরও মজবুত হচ্ছে।
‘সার্বিক বর্জ্য সংশোধন ও পরিচালনা: চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক আলোচনা চক্রের আয়োজন করেছিল বণিকসভা ফিকি (Federation of Indian Chambers of Commerce and Industry)। সেখানেই রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র করোনাকালে কলকাতার দূষণ পরিস্থিতি এবং এই সবুজ রক্ষাকবচ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, “করোনার সময়ে সবই থমকে গিয়েছিল—যা ছিল নজিরবিহীন। সেই সময়ে আমরা দেখি, সার্বিকভাবে দূষণ কমলেও বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM 2.5) তেমন কমেনি। সেটি ৪৭ শতাংশের নিচে নামেনি। এরপর আইআইটি-দিল্লির স্কুল অফ অ্যাটমস্ফেরিক স্টাডিজ়-এর সঙ্গে যৌথভাবে কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, এই দূষণের সবটাই স্থানীয় নয়। এর একটি বড় অংশ বাইরে থেকে আসছে। বিশ্বব্যাঙ্কও জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে যে বাতাস রাজ্যে প্রবেশ করে, সেটিই মূলত ভাসমান ধূলিকণা-সহ দূষণ বহন করে আনে। কিন্তু আমরা তো প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না—না হাওয়ার গতি, না বর্ষা।”
কারণ চিহ্নিত হওয়ার পরই ঝাড়খণ্ড-সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় সবুজ করিডর তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ঝাড়গ্রাম থেকে শুরু করে বন দপ্তরের সহযোগিতায় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া (আংশিক) হয়ে বীরভূম পর্যন্ত গড়ে তোলা হবে এই গাছের দেওয়াল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—ওই এলাকায় তো বন রয়েছে। নতুন করে কেন? কল্যাণ রুদ্র জানান, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সীমান্তবর্তী কোন কোন এলাকায় গাছের ঘনত্ব কম বা ফাঁকা জমি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত সেই বন দপ্তরের জমিতেই বৃক্ষরোপণ হচ্ছে।
গত বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝাড়গ্রামের পরে পুরুলিয়ায় প্রায় ৪০৫ হেক্টর জমিতে বনসৃজন করা হয়েছে। এ বছর প্রকল্পটি বীরভূমের দিকে এগোবে।
গাছ লাগানোর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হচ্ছে—এমনটাই দাবি পর্ষদের।
এই প্রকল্প শুধু দূষণ রোধ নয়, কর্মসংস্থানও তৈরি করছে। গত বছরে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে।
পাশাপাশি বনাঞ্চলে পড়ে থাকা পাতা-সহ জৈব বর্জ্য আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নির্দিষ্ট এলাকায় সেগুলি সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে জৈব জ্বালানি (biofuel) তৈরি করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী, বিভিন্ন কারখানায় দূষণ কমাতে পেট কোক ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে এবং মোট জ্বালানির অন্তত ৭ শতাংশ বায়ো ফুয়েল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে শিল্পমহলে এই জৈব জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে।
কল্যাণ রুদ্র জানান, উত্তরবঙ্গে একটি এবং জঙ্গলমহলে দুটি বনভিত্তিক জৈব জ্বালানির পাইলট প্রকল্প চলছে। সেগুলি সফল হলে ফিকি-সহ শিল্পমহলের সামনে বৃহত্তর আকারে এই উদ্যোগ তুলে ধরা হবে।
কারণ পশ্চিমবঙ্গে কৃষি ও বনজ বর্জ্যের বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে, যা ভারতের কার্বন-মুক্ত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।