নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, ধূমপানের বাইরেও বায়ুদূষণ ফুসফুসে ক্যানসারের বড় কারণ হয়ে উঠছে।
কোন কোন শহরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি?

ফুসফুসে ক্যানসার
শেষ আপডেট: 16 January 2026 02:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধূমপানই শেষ কথা নয়, ভারতে ফুসফুসের ক্যানসার (Lung Cancer) বাড়ছে এমন সব এলাকায়, যেখানে তামাকের ব্যবহার তুলনায় কম। এই চাঞ্চল্যকর ছবি উঠেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চে (Indian Journal of Medical Research, IJMR) প্রকাশিত সমীক্ষা বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ সমান নয়। অঞ্চলভেদে রোগের প্রকোপ, মৃত্যুহার এবং ঝুঁকির কারণগুলির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
গবেষণাটির নাম “Region-wise lung cancer burden, long-term trend & time-series forecasts in India”। গবেষকেরা একে ভারতের ৬টি অঞ্চলের ৫৭টি জনসংখ্যাভিত্তিক এলাকার উপর হওয়া সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ বলে দাবি করেছেন। গবেষণাটি করেছেন তিরুবনন্তপুরমের (Thiruvananthapuram) রিজিওনাল ক্যানসার সেন্টার (Regional Cancer Centre) এবং কর্নাটকের মানিপাল অ্যাকাডেমি অব হায়ার এডুকেশনের (Manipal Academy of Higher Education) গবেষকেরা।
সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের হার বেশি। মহিলাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রকোপ উত্তর-পূর্বে। যদিও উত্তর-পূর্ব ভারতে তামাক ব্যবহারের হার বেশি হওয়ায় বিষয়টি কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়, দক্ষিণ ভারতের ছবি আলাদা। গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণে যেখানে তামাক ও মাদক ব্যবহারের হার ২৫ শতাংশেরও কম, সেখানেও ফুসফুসের ক্যানসারের বয়স-মানকৃত আক্রান্তের হার (ASIR) বেশ উঁচু। গবেষকদের মতে, এখানেই ধূমপানের বাইরের কারণগুলির ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বায়ুদূষণ (Air Pollution)-এর উপর। সমীক্ষা বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার তামাক ছাড়া অন্য কারণে হয়। ভারতের ক্ষেত্রে বাতাসে থাকা ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা (Particulate Matter) অন্যতম বড় ঝুঁকি ডেকে আনে। অন্য গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ভারতে প্রায় ১৭ লক্ষ মৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণ দায়ী। পাশাপাশি, জ্বালানি হিসেবে বায়োমাস ব্যবহারের অভ্যাস (Biomass Fuel Use) এবং পরোক্ষ ধূমপানের (Second-hand Smoke) প্রভাবও বড়—দেশে ৪৮.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কোনও না কোনও ভাবে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার।
এই কারণেই ধূমপানের হার ১০ শতাংশের কম থাকা সত্ত্বেও বহু অঞ্চলে নারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার বাড়ছে বলে মত গবেষকদের। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অ্যাডেনোকারসিনোমা (Adenocarcinoma) নামের ক্যানসার এখন সবচেয়ে বেশি ও দ্রুত বাড়ছে—বিশেষত মহিলাদের মধ্যে। এই ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে বায়ুদূষণের যোগ বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোল্লামে (Kollam) তামাক ব্যবহারের হার ৫৬.৮ শতাংশ এবং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ফুসফুসের ক্যানসারের হারও বেশি। আবার শ্রীনগর (Srinagar), পুলওয়ামা (Pulwama), কান্নুর (Kannur), কাসারগোদের (Kasargod) মতো জায়গায় কম মাদক ও তামাক ব্যবহারের মধ্যেও ক্যানসারের হার উঁচু। উল্টো দিকে, ওয়ার্ধা (Wardha), মুজফ্ফরপুর (Muzaffarpur), প্রয়াগরাজে (Prayagraj) তামাক ব্যবহার বেশি হলেও রিপোর্ট করা ক্যানসারের হার কম-যা তথ্যের ঘাটতি বা চিকিৎসা-প্রবেশাধিকারের সমস্যাকে নির্দেশ করছে।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ভারতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, ফলে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর তথ্য ঠিকমতো নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সব মিলিয়ে গবেষকদের স্পষ্ট বার্তা- ফুসফুসের ক্যানসারকে শুধু ধূমপান থেকে হওয়া কোনও রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। অঞ্চলভেদে পরিবেশ, পেশাগত ঝুঁকি ও জীবনযাপনের কারণ খতিয়ে দেখতে না পারলে এই বাড়তে থাকা বিপদ ঠেকানো অসম্ভব।