ভোটের সময় নজরদারি আরও শক্ত করতে উন্নত প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা। জালিয়াতি ও অনিয়ম ঠেকাতে নতুন নজরদারি ব্যবস্থার প্রস্তুতি।

কড়া নজরে হবে ভোট! প্রতীকী ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 17 March 2026 17:44
ক্যামেরার চোখও যদি আগের মতো কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করে!
প্রযুক্তিকে আরও বেশি করে কাজে লাগিয়ে তাই আঁটোসাঁটো হচ্ছে এ বারের বিধানসভা ভোটে (West Bengal Assembly Election 2026) নজরদারির ব্যবস্থা। সব কিছু ঠিকঠাক চললে সেই পরিকাঠামো জোরদার করতে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবহার করা হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও (আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, AI)। আবার যে সব জায়গার বুথের কাছাকাছি টেলিকম পরিষেবা নেই (টেলিকম শিল্পের পরিভাষায় শ্যাডো জ়োন) বা দুর্বল, সেই সব এলাকা দ্রুত চিহ্নিত করে সেখানে টেলিকম পরিষেবা উন্নত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তত প্রাক-প্রস্তুতি পর্বে তেমনই ইঙ্গিত।
তবে প্রশাসনিক সূত্রের খবর, যা-ই পদক্ষেপ করা হোক না কেন, সবই নিয়মের মধ্যে থেকেই করা হবে। যাতে নাগরিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
ভোটে পাহারার ধরন নিয়ে রাজ্যে বরাবরই নানা অভিযোগ। রাজ্যের পুলিশ নিয়ে আগেও বিরোধীদের অভিযোগের পরে বাড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভারী বুটের শব্দ। এরপর যোগ হয় বুথে সিসিটিভি-র নজরদারিতে ভোট পরিচালনা। এত সব করেও কিন্তু এ রাজ্যে কতটা স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নে ভোট করা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বারবার।
যেমন গত লোকসভা নির্বাচনের সময়ে বুথে ক্যামেরা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোথাও কোথাও তা টানা দীর্ঘক্ষণ নাকি বন্ধ ছিল! আবার চললেও লেন্সে কী সব যেন লেগে ছিল! ফলে ছবির গুণগত মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। লাইভ চললেই বা কী!
বিভিন্ন দফা মিলিয়ে প্রায় ৩০% ক্যামেরা ঠিকমতো চলেইনি।
সাত দফাতেই ভোটের দিনে গড়ে ৪০০০ বা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক ক্যামেরা কমপক্ষে দুই থেকে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল। দিনের নানা সময়ই এই ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে আলাদা করে দেখলে টানা দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার ঘটনা ঘটেছিল দ্বিতীয় দফায়।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল সপ্তম দফার ভোটে। সে দিন কোথাও কোথাও টানা চার ঘণ্টারও বেশি সময় ক্যামেরা বন্ধ ছিল।
খুব গরম পরিবেশের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন জায়গায় ক্যামেরা কার্যকরী হয় না। কারণ সেগুলির নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি তাপ সহ্য করার ক্ষমতা থাকে না।
দেখা গিয়েছে, এমন জায়গায় সেগুলির কিছু বসানো হয়েছিল, যেখানে তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় পরিষেবা বিঘ্নিত হয়।
বুথের মধ্যে কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে টেলিকম সিগন্যাল বা সংযোগ না থাকার দাবি করা হলেও টেলিকম সংস্থাগুলির পাল্টা দাবি ছিল, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ও পরিষেবা চালু ছিল। তার প্রমাণ হিসাবে সেখানে লাইভ ভিডিও পাঠানো বা TRAI MYSPEED অ্যাপের স্পিড পরীক্ষার তথ্যও দেওয়া হয়।
বহু জায়গায় ক্যামেরা লাইভ থাকলেও দৃশ্যমানতা খুব খারাপ, এমন ঘটনার জন্য সংযোগ-সমস্যাকেই তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়। কোথাও সফটওয়্যার আপডেট করা বাকি ছিল, কোথাওবা আবার ক্যামেরার লেন্সে আঠার মতো কিছু লেগে ছিল।
অনেক জায়গাতেই কার্যত স্থির ভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। ফলে পরিস্থিতির প্রয়োজনে সেগুলিকে নির্দিষ্ট দিকে বা লক্ষ্যে ঘোরানো যায়নি।
কেন্দ্রীয় টেলিকম দফতর বা ডট-এর পূর্বাঞ্চলীয় কেন্দ্রে সব ক্যামেরার বৈধতা খতিয়ে দেখার প্রস্তাব থাকলেও ঠিক সময়ে সেগুলির জোগান দেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে খারাপ চলা ক্যামেরাগুলির পূর্ণাঙ্গ লাইভ তথ্য পাওয়া যায়নি। লাইভ স্ট্রিমিং হয়ে যাওয়ার পরে সেগুলির অফলাইন তথ্য পাওয়া যায়।
গতবারের পরস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখার পরে এ বারে নির্বাচন কমিশন, এনআইসি এই নজরদারির ব্যবস্থাটিকে আরও বেশি ত্রুটিমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ তৈরির পরিকল্পনা নিচ্ছে। যেমন একটি নয়, একাধিক সংস্থাকে ক্যামেরা সংক্রান্ত বরাত দেওয়া হবে।
এছাড়াও সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ ভুমিকা নিতে পারে এআই ও আধুনিক টেলিকম প্রযুক্তি। যেমন বুথে ভোট পরিচালনার সঙ্গে যুক্তরা ছাড়া বাকিদের অবাধ যাতায়াত রুখতে ওই সব প্রযুক্তির মাধ্যমে মুখের ছবি খতিয়ে দেখার লাইভ পরিচালনা করার কথা ভাবা হচ্ছে। ভোটারেরও মাত্র একবারই বুথে ঢোকার কথা। কী ভাবে কার্যকর হতে পারে এই প্রযুক্তি? প্রশাসনিক সূত্রের খবর, অবাঞ্ছিত কেউ একাধিকবার বুথে ঢুকলেই তাঁর সেই মুখের ছবি নিয়ে কন্ট্রোল রুমকে সতর্ক করতে পারে গোটা সিস্টেমটি।
এআই-এর ব্যবহার নিয়ে অবশ্য অনেক সময়ই কিছু প্রশ্ন ওঠে। ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও তা কতটা কার্যকর ছিল, তাই নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। যদিও সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের পাল্টা দাবি, ওই তালিকায় অনেক অসঙ্গতি এই প্রযুক্তি দিয়েই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
পাশাপাশি, আগে বুথে একটিই ক্যামেরা বসানো হলেও এবারে দু'টি করে ক্যামেরা বসানোর কথা ভাবা হচ্ছে। যাতে কারও ঢোকা ও বেরোনো, উভয়দিকের ছবিই ধরা যায়।
এখনও অনেক জায়গাতেই টেলিকম পরিষেবা ভাল নয়। বিশেষ করে কোনও বুথ এলাকায় পরিষেবার হাল খারাপ নাকি সেগুলো আশপাশের শ্যাডো-জ়োনের মধ্যে পড়ছে, তা-ও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে টেলিকম সংস্থাগুলিকে। সে ক্ষেত্রে সেই সব এলাকায় পরিষেবা উন্নত করাই লক্ষ্য।
কেউ নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে কোনও প্রভাব খাটাতে গেলে অথবা অবাঞ্ছিত কেউ অন্য এলাকায় ঢুকে পড়ছেন কিনা, সে সব নজরদারির ক্ষেত্রেও জিও-ফেনসিং প্রযুক্তি কাজে লাগানো যায় বলেও মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি রাজ্যের বাইরে থেকে বহিরাগতদের প্রবেশ আটকানোর পন্থা, অভিযোগ এলে দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা গড়া, সংশ্লিষ্ট মহলের খবর, এমন নানা বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে কাগজে-কলমে প্ল্যান তৈরি নয়, শেষ পর্যন্ত কতটা কী বাস্তবে হয়, আর তার কতটা ঠিকমতো কার্যকর হয়, ভোটের সময়ে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।