বিহারে ভোটার লিস্টে যে নিবিড় সংশোধন (SIR) হয়েছে, এবার বাংলাতেও হবে।

ছবি - AI
শেষ আপডেট: 3 August 2025 15:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবারের আড্ডা। বেলা গড়িয়ে তখন দুপুর সাড়ে ১২টা হবে। মুকুন্দপুরে পল্টুর চায়ের দোকানের পিছনে আড্ডা ততক্ষণে জমজমাট। বিধান মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত) বেঞ্চের উপরই পা গুটিয়ে বাবু হয়ে বসে আছেন। এক সময়ে চুটিয়ে পার্টির কাজ করতেন। এখন অফিস আর সংসারের চাপে অতটা সময় দিতে পারেন না। দল ক্ষমতায় নেই কতদিন হয়ে গেল। তবে মেজাজটা রয়ে গেছে। মুঠো বন্ধ করে সিগারেটে টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়ার অভ্যেসটা যায়নি।
দু’হাত তফাতে দাঁড়িয়ে শীর্ণ চেহারার ভজা (নাম পরিবর্তিত)। কোমর টেনেটুনে ২৮ ইঞ্চি। গালে খোঁচা দাড়ি, সামনের দাঁতগুলো বিড়ি খেয়ে কালো হয়ে গেছে। ও রুলিং পার্টি করে। বাকিরা এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে বিধানের কথাই শুনছিলেন।
বিধান বলছিলেন, ভোটার লিস্টের কথা। বিহারে ভোটার লিস্টে যে নিবিড় সংশোধন (SIR) হয়েছে, এবার বাংলাতেও হবে। সংশোধনের পর বিহারে ভোটার লিস্ট থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেছে। কমিশন জানিয়েছে, এর মধ্যে ২২ লক্ষই মৃত।
চায়ের কাপটা বাঁ হাত দিয়ে পাশে বেঞ্চের উপর রেখে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন বিধান। তার পর বললেন বলি শোন, “আমাদের বুথেই ভোটার লিস্টে অন্তত ১০০টা মরা মানুষের নাম রয়েছে। আমার বাবার নামটাও রয়ে গেছে। বাদ দেওয়া হয়নি”।
“ভাব একবার। একটা বুথেই যদি ১০০ জনের নাম বাদ যায় তো গোটা বিধানসভায় কত মৃত ভোটারের নাম ভোটার লিস্টে রয়েছে! এঁদের ভোটটাই তো ওরা ভোটের দিন চুপচাপ ফেলে দেয়। বিকেল তিনটে বেজে গেলেই খেলা শুরু”।
ভজা পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বললেন, “দাদা অপরাধ নিও না। বছরে দু’বছরে ওই একদিনই তো আমরা এলাকার মৃত মানুষদের একটু স্মরণ করি। শ্রদ্ধা জানাই। ওদের ভোটাধিকারটা যাতে বেঁচে থাকে তাই বোতাম টিপে দিই”।
বিধান উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও সময় নিলেন না। হেসে বললেন, “এবার আমার মরা বাপটা যখন ভোট দিতে আসবে আমাকে ডাকিস। দু’বছর হল বাবা মারা গেছে। আহারে তবু তো দেখা হবে”।
পল্টুর চায়ের ঠেকে যেন হাসির সাইক্লোন উঠল। বেচারা সাধন পাল (নাম পরিবর্তিত) সবে চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে একটা কামড় মেরেছিলেন, হাসতে হাসতে কাশতে কাশতে একাকার কাণ্ড। পল্টু চায়ের গ্লাসে খটাখট করে চামচ নেড়ে চিনি গুলছিল, থামিয়ে দিয়ে সেও হেসে খুন।
শেষমেশ কোনও কাণ্ড ঘটে না গেলে আগস্ট মাসেই বাংলায় ভোটার লিস্টে নিবিড় সংশোধনের কাজ শুরু হওয়ার কথা। রাজ্যে ৮০ হাজার বুথ রয়েছে। প্রতি বুথে ভোটার তালিকায় ১০ জন মৃত ব্যক্তির নাম থাকলেও ৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার কথা। সেই সঙ্গে কমিশন সংশোধনের যে সব শর্ত দিয়েছে, এখন তা নিয়েই সত্যি মিথ্যে বিভ্রান্তি মাখিয়ে পাড়ায় পাড়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সেই সঙ্গে দলা পাকিয়ে উঠছে আশঙ্কাও। পল্টুর দোকানে যে রকম বন্ধুত্বের পরিবেশে শাসক-বিরোধী ক্যাডারের আলোচনা চলছিল, তা এখন বিরল। ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই বিএলএ (BLA) তথা বুথ লেভেল এজেন্ট নিয়োগ করতে হবে। একে তো সংশয় রয়েছে ৮০ হাজার বুথে বিজেপি বা সিপিএম আদৌ বিএলএ দিতে পারবে কিনা। যেখানে তাদের বিএলএ থাকবে তাঁর সঙ্গে তৃণমূলের বিএলএ-র মতান্তর বা সংঘাতের স্বরূপটাই বা কেমন হবে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের কথায়, বাম জমানায় এই সব মৃত ভোটারের ভোট ব্যালট বাক্সে খুব সুনিয়োজিত ভাবে ফেলে দিতেন সিপিএমের ক্যাডাররা। বুথে কোন পাড়ায় কোন বাড়িতে কে মারা গেছে, কে শহরে নেই, তার ভোট দিয়ে দেওয়ার জন্য আগে থেকেই কৌশল ঠিক থাকত বলে অভিযোগ। একবার তো বিধাননগরের এক ভোটে কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতির ভোটও ফেলে দিয়েছিল সিপিএম। এখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযোগ তেমনই।
আবার কমিশনের এক কর্তার কথায়, ভোটার লিস্ট থেকে মৃত বা অস্তিত্ব নেই এমন ভোটারের সব নাম বাদ দিতে পারলে—না থাকবে বাঁশ না বাজবে বাঁশুরি।
তবে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, বাদ দেবে কে? বিএলও? বিএলএ। কমিশন বাংলায় মৃত ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতে চাইলেও তা পারবে তো? নাকি ভোটের দিনই বুথে গিয়ে মরা বাপের সঙ্গে দেখা হবে বিধান মণ্ডলের।
এখনও অবধি কারও কাছে স্পষ্ট জবাব নেই।