
গোপালপুর মুক্তকেশী উচ্চ বিদ্যালয়
শেষ আপডেট: 20 March 2025 17:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ যেন আরেক ‘সন্দীপন পাঠশালা'র গল্প!
তারাশঙ্করের উপন্যাসের চরিত্র সীতারাম। জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রত্নহাটা গ্রামে গড়ে তুলেছিল স্বপ্নের পাঠশালা। অবচেতনে সান্দীপনি মুনির পৌরাণিক মিথ। সীতারামের ইচ্ছে ছিল, তাঁর হাতেগড়া কিশোরের দল জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করবে। ঝাঁপিয়ে পড়বে স্বাধীনতা আন্দোলনে।
বর্ধমান জেলার গোপালপুরের অবিনাশচন্দ্র হালদার কি এই আখ্যান পড়েছিলেন? নয়তো তারশঙ্করের উপন্যাসে বিধৃত সময়কালের সঙ্গে অবিনাশ হালদারের কর্মজীবন হুবহু মিলে যায় কী করে! সীতারামের পাঠশালা গড়ে উঠেছিল ১৯২০ সালে৷ আর দেশের স্বার্থে নিবেদিতপ্রাণ অবিনাশও আরাধ্যা দেবী মুক্তকেশীর নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত করেন এর ঠিক দু'বছর বাদে—১৯২২-এ।
দেশপ্রেমিক তিনি। ভাষাপ্রেমীও বটে। অবিনাশবাবু চাইতেন তাঁর গ্রাম গোপালপুরের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখুক মুখের ভাষায়, মাতৃভাষায়। তাই নিজের জমিতে গড়ে তোলা ‘গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে'র পঠনপাঠনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন বাংলা। সীতারাম চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছিল পাশ্চাত্য বিদ্যাচর্চা ও আরোপিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। অবিনাশ হালদারও একইভাবে গান্ধীজির ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশ ঐতিহ্য ও প্রভাবকে সচেতনভাবে অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিলেন। যার প্রমাণ ধরা আছে একটি ছোট্ট নিয়মে: স্কুল খোলা রবিবার। প্রয়োজনে ‘কাজের দিন’ থেকে একদিন ছুটি ঘোষণা করা যেতে পারে। কিন্তু রবিবার ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী—সবাইকে বিদ্যালয়ে আসতেই হবে।
১৯২২ সালে প্রতি রবিবার স্কুল খুলে রাখার রেওয়াজ চালু করেন অবিনাশবাবু। যেহেতু সপ্তাহের শেষ দিন বিদ্যায়তন বন্ধ রাখাটা ব্রিটিশ-প্রভাবিত রীতি, তাই ইচ্ছে করে এমন নিয়মের প্রণয়ন। পাশ্চাত্য-বিরোধিতার সেই চল, শতবর্ষ পেরিয়ে আজও একই রকম রয়ে গিয়েছে। ২০২৫ সালেও গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় খোলা থাকে প্রত্যেক রবিবার৷ ঘণ্টা পড়ে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসে, ক্লাস হয়। সবকিছুই সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর মতো। কোনও কাটছাঁট নেই।
আজ স্কুলের বাইরে সুউচ্চ গেট। দোতলা বিল্ডিং। পাকা ছাদ। অথচ জন্মলগ্নে এসব কিছুই ছিল না। খেজুরের ডাল, বাঁশ ও ছাউনি দিয়ে কোনওমতে একটা আটচালা বানিয়ে বিদ্যালয় খাড়া করেছিলেন অবিনাশ হালদার। ঝাঁ-চকচকে ব্যবস্থা, সুযোগসুবিধা তো অনেক দূরের গল্প। তবু উড়ান থামেনি। সুশিক্ষার টানে, পুথিগত পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র তৈরির উদ্দেশ্যে সন্তানদের এখানেই পাঠাতে থাকেন গোপালপুর ও আশপাশ গ্রামেগঞ্জের অনেক পরিবার। শুধু পরিকাঠামো কিংবা আর্থিক অপ্রতুলতা ঘিরে নয়, অসুবিধা দানা বাঁধতে শুরু করেছিল অসহযোগিতা নিয়েও। ইংরেজিকে ব্রাত্য রাখার খেসারত দেন অবিনাশবাবু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মুখ ফেরায়৷ অনুমোদন দিতে অস্বীকার করে।
তবু অকুতোভয় মানুষটা দমে যাননি। পাশে পান রাজবল্লভ কুমার, বিজয়কৃষ্ণ কুমার, ভূষণচন্দ্র হালদারের মতো একঝাঁক উদ্যমী যুবককে। সকলে মিলে মেতে ওঠেন বিদ্যালয়কে ঢেলে সাজানোর আয়োজনে। দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন অবিনাশ স্বয়ং। গান্ধিজির শান্তিকল্যাণের আদর্শ, শ্রীচৈতন্যের ‘তৃণাদপি সুনীচেন'র বার্তা ছড়িয়ে দিতে চক-পেন্সিলের পাশাপাশি তুলে নেন কড়াই-খুন্তি। রাঁধতেন, বাড়তেন, পেট পুরে ছাত্রদের খাওয়াতেন। সব একা হাতে। নিজের উদ্যোগে।
কিন্তু শুধু উৎসাহ, উদ্যমে তো স্কুল চলে না। চাই শিক্ষক। যার সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে থাকেন অবিনাশ। অবশেষে খোঁজ মেলে। এগিয়ে আসেন পাশের গ্রাম নদীপুরের শিক্ষাবিদ ভূপেন্দ্রনাথ নায়েক৷ আমৃত্যু গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি৷
এভাবে ছড়িয়ে পড়ে নাম। বাড়তে থাকে কদর। জোটে স্বীকৃতি। সমাদর। আর্থিক আনুকুল্য। অভিভাবকেরা ছেলেমেয়েদের আরও বেশি করে পাঠাতে শুরু করেন। ছাউনির আটচালা পাকা দালানের চেহারা নেয়। নব্বই জন শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়ায় নশো-য়। দুই শিক্ষকের ডিঙিনৌকো উথাল-পাতাল কালসাগরের তুফান সামলে নেয়। আজ তার কাণ্ডারী শিক্ষক ২৫ জন। বহু প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের সূতিকাগার বর্ধমান জেলার এই বিদ্যালয়। রাঢ়বাংলার ভূমিপুত্র সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁদেরই একজন৷ ‘প্রেমের প্রথম পাঠ’ (উপন্যাস) ও ‘পুষ্পবনে হত্যাকাণ্ডে'র মতো ছোটগল্পে পটভূমি হিসেবে উঠে এসেছে গোপালপুর।
স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনের যুগ আজ স্মৃতিগর্ভে বিলীন৷ বারুদের ঘ্রাণ ধুলোয় মিশে গিয়েছে। রত্নহাটার দরিদ্র পণ্ডিত সীতারাম পারেনি তার সন্দীপন পাঠশালাকে টিকিয়ে রাখতে৷ ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষাকর, ফ্রি ইউ-পি স্কুলের দাপাদাপির জেরে তার স্বপ্নের দুয়ারে তালা পড়েছিল। দেশপ্রাণ অবিনাশচন্দ্র হালদার পেরেছেন৷ তাঁর কল্পনার বীজ পরিণত হয়েছে নিশানভেদী মহীরূহে৷ যার বল্কলে মিশে রয়েছে যন্ত্রণার আঁচড়, উদ্যমের ঘ্রাণ।