রাজ্যের অন্য এলাকাতেও প্রকল্প চালু করার ঘোষণা হয়েছে, আর সেই প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে নন্দীগ্রাম—যার রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার উপায় নেই।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী
শেষ আপডেট: 27 December 2025 18:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এত দিন পর্যন্ত ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের গণ্ডি পেরোয়নি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) ‘সেবাশ্রয় প্রকল্প’ (Sebaashray)। কিন্তু এ বার সেই কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (TMC)। রাজ্যের অন্য এলাকাতেও প্রকল্প চালু করার ঘোষণা হয়েছে, আর সেই প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে নন্দীগ্রাম—যার রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
শনিবার সাংবাদিক বৈঠক থেকে অভিষেক জানিয়ে দিলেন ১৫ জানুয়ারি থেকে নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় শুরু হতে চলেছে।
নন্দীগ্রামই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামান্য দেড় হাজারের কিছু বেশি ভোটে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু। সেই নন্দীগ্রামেই ‘সেবাশ্রয় প্রকল্প’ নিয়ে অভিষেকের পা রাখার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে আলাদা করে নজর কেড়েছে।
ডায়মন্ড হারবারে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, পরিষেবা ও সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন অভিষেক। এ বার সেই মডেলকে রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। আর নন্দীগ্রাম দিয়ে শুরু মানে, রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে এক নতুন কৌশলগত চাল— এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় এবং শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান—এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে মমতা যে নন্দীগ্রাম থেকে লড়ছেন না, তা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু তৃণমূলের অন্দরে মনে করা হচ্ছে, শুভেন্দুকে তাঁর নিজের জমিতেই রাজনৈতিক ভাবে চাপে ফেলার এটাই বড় সুযোগ। আর সেই লড়াইয়ের অন্যতম অস্ত্র হতে পারে জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্য ও পরিষেবা শিবির।
কোভিড পর্বে ডায়মন্ড হারবারে চালু হওয়া ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয় শিবির’ রাজ্য জুড়ে যে সাড়া ফেলেছিল, তা তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছিল অনেক আগেই। ঘটনাচক্রে, সেই সময় থেকেই নন্দীগ্রাম থেকেও একের পর এক আবেদন জমা পড়তে থাকে— ডায়মন্ড হারবারের মতোই সেখানে এমন শিবির করার জন্য। শেষ পর্যন্ত সেই ভাবনাই বাস্তব রূপ নিতে চলেছে।
নন্দীগ্রামে অভিষেকের পরিকল্পনায় ‘সেবাশ্রয় শিবির’ চালু হওয়া নিছক প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং তার রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট। এক দিকে, এটি সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীর ঘাঁটিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ ছোড়া। অন্য দিকে, নন্দীগ্রামের মানুষকে এই বার্তা দেওয়া যে সরকারি পরিষেবা কোনও দলের বা ভোটের অঙ্কে বাঁধা নয়।
বকলমে অভিষেক এও বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে অতীতে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাররা শুভেন্দুকে ভোট দিলেও, সরকার বা শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করছে না।
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে নন্দীগ্রামের দুই ব্লকে এই শিবির শুরু হবে। শিবির চলবে সাত থেকে দশ দিন। তৃণমূল সূত্রের খবর, অভিষেক নিজেও সেখানে উপস্থিত থাকবেন। কারণ, তাঁর অনুপস্থিতিতে এই উদ্যোগের যে রাজনৈতিক ও জনসংযোগমূলক লক্ষ্য, তা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। যদিও তিনি শিবিরের প্রথম দিন যাবেন, না কি শেষে জনসভা করবেন—তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
জানুয়ারির শুরু থেকেই অভিষেকের কর্মসূচি বেশ ঘন। ৩ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গ সফর শুরু করবেন তিনি। তার আগে ২ তারিখে যাবেন বারুইপুরে। জানুয়ারির মাঝামাঝি পূর্ব মেদিনীপুরে তাঁর একটি জনসভার সম্ভাবনাও রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, সেই সভা থেকেই নন্দীগ্রামে ‘সেবাশ্রয় শিবির’ চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারেন তিনি।
ডায়মন্ড হারবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নন্দীগ্রামেই কেন এই উদ্যোগ, তা বোঝার জন্য খুব বেশি বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। নন্দীগ্রাম মানেই রাজ্যের রাজনীতিতে এক প্রতীকী কেন্দ্র।