বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত (Supreme Court on Kaliachak Incident) পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিল, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই, এবং বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে।

সুপ্রিম কোর্ট
শেষ আপডেট: 2 April 2026 14:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুধবার রাতে মালদহে মোথাবাড়ি এলাকায় জুডিশিয়াল অফিসারদের ঘেরাওয়ের ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত (Supreme Court on Kaliachak Incident) পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিল, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই, এবং বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে।
কালিয়াচকে বিডিও অফিসে ৭ বিচারককে আটক করে রাখার ঘটনা নিয়ে শুধু রাজ্য রাজনীতি আন্দোলিত তা নয়, জাতীয় স্তরেও তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে সেই খবর পৌঁছে গেছে সুপ্রিম কোর্টেও। এদিন এমনিতেই এসআইআর মামলার শুনানি ছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পঞ্চোলির বেঞ্চে এদিন শুনানি সেই শুরু হতেই প্রশ্নের মুখে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও প্রশাসন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে আইনজীবী কপিল সিবাল ও মেনকা গুরুস্বামীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রশ্ন তোলেন, “কী ঘটেছে, তা কি দেখেছেন?” উত্তরে আইনজীবী কপিল সিবাল বলেন, হ্যাঁ তিনি রিপোর্ট পড়েছেন।
আদালতে এদিন কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, এই ঘটনা “কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়”। অন্যদিকে আবেদনকারীদের তরফে মেনকা গুরুস্বামী জানান, ঘটনাটি ছিল একটি ‘অরাজনৈতিক প্রতিবাদ’। তবে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, এই বিষয়কে রাজনৈতিক রং দিতে চায় না আদালত।
বুধবার রাতে যে ৭ জন বিচারককে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে ছিলেন তিনজন মহিলা। তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে আদালত জানায়, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে গভীর রাতে হোম সেক্রেটারি ও ডিজিপি প্রধান বিচারপতির বাসভবনে পৌঁছন। রাত ১২টার পর গিয়ে ওই বিচারকদের মুক্ত করা সম্ভব হয়।
আরও ভয়াবহ ব্যাপার হল, ওই ৭ বিচারককে উদ্ধার করে বাড়ি ফেরানোর সময়ে বিচারকদের গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট এদিন পর্যবেক্ষণে জানায়, এই ঘটনা শুধু বিচারকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা নয়, বরং তা আদালতের ক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত। আদালত জানায়, SIR প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত বিচারকরা আদালতের ‘প্রসারিত হাত’ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের বাধা দেওয়া মানে বিচারব্যবস্থার ওপরই আক্রমণ।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “যাঁদের উপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কেন যথাসময়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হয়নি?”
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আরও জানান, রাত ১১টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি একটি ৫ বছরের শিশুকেও জল ও খাবার দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে - এক, বিচারকদের থাকার জায়গায় (সরকারি অতিথি গৃহসহ) পর্যাপ্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করতে হবে। দুই, কোনও বিচারকের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলে তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং তিন, কোনও জায়গায় পাঁচ জনের বেশি জমায়েত করা যাবে না।
এই ঘটনার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিজিপি, জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারকে শো-কজ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি ৬ এপ্রিল তাঁদের অনলাইনে আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট এদিন স্পষ্ট জানায়, এই ধরনের ঘটনা ‘ক্রিমিনাল কনটেম্পট’ বা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়তে পারে। এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে শুধু আইনি লড়াই নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা ইস্যুও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থান এই বার্তাই দিচ্ছে—বিচারব্যবস্থার কাজে হস্তক্ষেপ বা ভয় দেখানোর কোনও প্রচেষ্টা সহ্য করা হবে না।