থাকেন নদিয়ার (Nadia Farmer) করিমপুর থানা এলাকার কিশোরপুর নামে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। যেখানে ধূ ধূ করে মাঠ, খেত। পেশায় চাষি হলেও আজিবর ‘নাগরিক কবিয়াল’।
.jpeg.webp)
আজিবর মণ্ডল, ভাইরাল কবিতাওয়ালা
শেষ আপডেট: 23 January 2026 22:35
“ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল,
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে।”
রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) লিখেছিলেন বটে। কিন্তু, যাঁরা বীজ বোনেন, তাঁদেরই কাউকে কাউকে মাটি যেমন ছোঁয়, কবিতাও (Bengali Poem) ছুঁয়ে ফেলে। আজিবর মণ্ডলও (Ajibar Mondal) তাঁদেরই একজন। থাকেন নদিয়ার (Nadia Farmer) করিমপুর থানা এলাকার কিশোরপুর নামে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। যেখানে ধূ ধূ করে মাঠ, খেত। পেশায় চাষি হলেও আজিবর ‘নাগরিক কবিয়াল’। সম্প্রতি তাঁর আবৃত্তি, কবিতাপাঠ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল (Viral Farmer Poet)। মাথায় গামছার ফেট্টি। মুখে সবসময় লেগে থাকা হাসি। সামান্য ভূমিকা দিয়েই তিনি কবিতা আওড়ে যান অনায়াসে। কবিতা তো অনেকেই বলেন, পাঠ করেন, কিন্তু তাঁর বলার ধরনে যে সহজতা রয়েছে, তা ছুঁয়ে যাওয়া জাদুকরী। যে কারণে রাত বিরেতে ফোন করে সেই ‘কবিতাওয়ালা’ আজিবর মণ্ডলকে বিরক্ত না করে পারা গেল না।
দেখা না গেলেও, তাঁর সঙ্গে কথা বলেই বোঝা যাচ্ছিল, ঠোঁটে হাসিটা নির্ঘাত লেগেই আছে। তবে আফসোস কম নেই। উচ্চ মাধ্যমিক (Higher Secondary) পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন আজিবর। গ্র্যাজুয়েশনের (Graduation) ইচ্ছে থাকলেও পরিস্থিতি সে সুযোগ করে দেয়নি। মায়ের চলে যাওয়া, দাদারা কাজ করছেন।মেজদা একা লাঙল টানছেন। আজিবরের মনে হল, সঙ্গে থেকে যদি কিছুটা পাশে থাকা যায়! যদিও তাঁর কথায়, “অজুহাত দিতে চাই না জানেন তো! আমি মনে করি ইচ্ছে করলেই পড়াশোনাটা করা যেত। কিন্তু ওই যে, বয়সের দোষ।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) ‘কবিতাওয়ালা’ (Kabitawala) পেজে আজিবরের ভিডিও (Viral Video), কবিতা যাঁরা দেখেছেন-শুনেছেন, তাঁদের কাছে ছবিটা পরিষ্কার। মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ান। ভূমিকায় কবিতার গল্প বলে আওড়ে যান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের (Sunil Ganguly) ‘শুধু কবিতার জন্য’, জীবনানন্দ দাশের (Jibanananda Dash) ‘আবার আসিব ফিরে’, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর (Nirendranath Chakraborty) ‘অমলকান্তি’। পরিচিতি পেতে বেশি সময় নেয়নি তাঁর কবিতাপাঠ। ইতিমধ্যেই এক একটি ভিডিও লক্ষ লক্ষ মানুষের মন জয় করেছে। তাঁর স্বরচিত কবিতাও নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। ইদানিং তিনি ‘খ্যাত’।
ফোনে এ ব্যাপারেই কথা বলতে বলতে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, কেমন লাগে? খানিক থমকেই বললেন, “কবিখ্যাতি বড় বিষম বস্তু।” কথাটার মধ্যে রসিকতা আছে, আবার অভিজ্ঞতার ভারও আছে। তিনি চাষি—মাটিই তাঁর জীবিকা। আবার তিনিই কবি, আবৃত্তিকার। তাঁরও হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল। দিনের শেষে খেতের ধুলো ঝেড়ে আজিবর যেমন ঘরে ফেরেন, তেমনই শব্দের ধুলো ঝেড়ে কবিতার লাইনে দাঁড়ান। তাই কবিখ্যাতির কথা উঠলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। কিন্তু বিদেশ বিভূঁই থেকে যখন বাঙালিরা তাঁকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান, সেটা প্রাপ্তি হিসেবেই দেখেন।
বাংলা ভাষায় কবিতা লেখা যেন এক প্রকার সামাজিক অভ্যাস। বাজারে কথাই আছে, কৈশোর বা যৌবনে কবিতা লেখেনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। কবিতার নেশা যে ছোঁয়াচে রোগের মতো, সে কথা তো আজকের নয়। বহু আগেই সুকুমার রায় (Sukumar Ray) তাঁর ‘আশ্চর্য কবিতা’ গল্পে সে রোগের লক্ষণ লিখে গিয়েছিলেন।
সে কালের বাঙালি যেমন কবিতায় আক্রান্ত ছিল, এ কালের আজিবরও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর বলার ধরনের মধ্যে যে মেঠো গন্ধ আছে, তাই-ই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। যে কারণে গ্রামের ‘মিলন উৎসব’-এ তাঁর প্রকট ভূমিকা থাকে। তবে ‘কবিতাওয়ালা’ যে শুধু কবিতাই পাঠ করেন তা নয়। লেখেনও। কিন্তু নিজেকে কবি বলতে তাঁর প্রবল আপত্তি। আজিবরের কথায়, “আমার কবিতাকে আমি কবিতা মনে করি না। নিজেকে কবিও বলি না। টুয়েলভ পাশ একজন যদি খানিক লিখে কবি হয়ে ওঠেন, সেটা বাংলা সাহিত্যে অন্যায়। বলা যেতে পারে, কবিতা লেখাটা আমার একটা বদভ্যাস।” আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাওয়া? তাঁর উত্তর, “একদিন কী মনে হল, ধূমপান করতে করতে ভাবলাম একটা কবিতা বলি। ফোনের ক্যামেরাটা অন করে ভিডিও করলাম। ফেসবুকে পোস্ট করলাম। দেখলাম মানুষ পছন্দ করছে। ভাইরাল হয়ে গেলাম।”