উত্তর ২৪ পরগনার স্কুলছাত্ররা বাঁশ, তামার তার আর অ্যালুমিনিয়াম পাত দিয়ে বানাল বজ্রনিরোধক যন্ত্র। বাজারি যন্ত্রের তুলনায় সস্তা ও কার্যকর।

ছাত্রদের আবিষ্কার!
শেষ আপডেট: 1 August 2025 19:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলার গ্রামে গ্রামে বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর প্রায়ই সামনে আসছে গত কয়েক দিন ধরে। সেই ক্ষতি ঠেকাতে এবার কাজে নেমেছে উত্তর ২৪ পরগনার এক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। অ্যালুমিনিয়াম পাত, তামার তার আর বাঁশের খুঁটি—এই সহজলভ্য উপকরণে তৈরি হচ্ছে এক অভিনব ‘দেশি’ বজ্রনিরোধক যন্ত্র, যা রক্ষা করছে চাষের জমি আর চাষিকে। শিক্ষক পশুপতি মণ্ডলের নেতৃত্বে তৈরি এই যন্ত্র কার্যকারিতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখন কৃষকদের কাছে সুরক্ষার নতুন আশার আলো।
গোসাবার বিপ্রদাসপুর গ্রামের কৃষক পঞ্চানন মণ্ডল এখন কর্নাটকে ধান রোয়ার কাজে গিয়েছেন। তবে দূর দেশেও তাঁর চিন্তা বাংলার জমিকে ঘিরেই। কারণ, সেখানেই নিজের খেতে বসিয়েছেন এক বিশেষ বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র— যা শিক্ষক পশুপতি মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে তৈরি করেছে তাঁর জেলার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা।
তিনি বলেন, “এখানেও বাজ পড়ে মাঝেমাঝেই। যদি এখানে আমার সেই যন্ত্রটা থাকত, আরও নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারতাম।”
প্রচলিত বাজারি 'লাইটনিং অ্যারেস্টার'-এর থেকে এই যন্ত্র অনেকটা আলাদা। তা যেমন সস্তা, তেমনি উপকরণও স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য। বাঁশের খুঁটি, তামার তার, সাইকেলের রিম বা পাতলা অ্যালুমিনিয়াম— এই সব নিয়েই বানানো হচ্ছে যন্ত্রটি।
উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুর দেশবন্ধু বিদ্যাপীঠ (বালক)-এর পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ড. পশুপতি মণ্ডলের মাথাতেই প্রথম এই ভাবনার জন্ম। একের পর এক বাজে প্রাণ হারাতে দেখেছেন গ্রামের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে খোলা জমিতে বা জলে থাকাকালীন সময়ে।
তিনি বলেন, “বজ্রপাত তো গ্রামাঞ্চলেই বেশি পড়ে। অথচ এসব প্রান্তিক মানুষের কোনও সুরক্ষা নেই।”
গবেষণাপত্র পড়ে তিনি আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যান। প্রথমে সাইকেলের রিম দিয়ে প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি হলেও, পরবর্তীতে এটি বহুবার উন্নত করা হয়েছে। এখন রিমের বদলে পাতলা অ্যালুমিনিয়াম পাত ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ছুঁচোল ধারযুক্ত তামার তার দিয়ে তৈরি স্পোকগুলি আর্থিংয়ের কাজ করছে।
এই যন্ত্রের গঠন খুবই সরল। একটি লম্বা বাঁশের খুঁটির মাথায় পাতলা অ্যালুমিনিয়াম পাত দিয়ে ছুঁচোল প্রান্তযুক্ত একটি গোলাকার রিং। সেখান থেকে নিচে নামছে তামার তার, যা আর্থিংয়ের জন্য মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়।
প্রচলিত যন্ত্রে যেখানে মাত্র ৩-৫টি ছুঁচোল প্রান্ত থাকে, সেখানে এই যন্ত্রে প্রায় ৩,০০০ ছুঁচোল বিন্দু রয়েছে। ফলে এটি বৃহত্তর এলাকা কভার করতে সক্ষম। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক-একটি যন্ত্র ১৯০ থেকে ২১০ মিটার পর্যন্ত ব্যাসার্ধের এলাকায় বজ্রপাত রুখতে পারে।
এই যন্ত্রের কার্যকারিতা স্বীকৃতিও পেয়েছে—বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল পাওয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউট এটিকে পরীক্ষায় সফল ঘোষণা করেছে।
এই উদ্যোগে শুধু স্কুল নয়, যুক্ত হয়েছেন হ্যাম রেডিও অপারেটররাও। ড. মণ্ডল ‘ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত, যেখানে হ্যাম রেডিও প্রশিক্ষণ চলে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলেন, “আমরাও খোলা জায়গায় দামী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করি। তাই বজ্রপাত প্রতিরোধে এমন যন্ত্র খুবই দরকার।"
যন্ত্র তৈরি ও মাঠে বসানোর কাজ শিক্ষার্থীরাই করছে হাতে-কলমে। খরচ পড়ে মাত্র ২,০০০ টাকার মতো। প্রথমদিকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চাষিদের জমিতে এটি বসিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
তবে যন্ত্র বসাতে হলে কিছু নিয়ম মানতেই হয়। যেমন, যন্ত্রের চারপাশে যেন বড় গাছ না থাকে, কিংবা তার আর্থিং-এর তারটি যেন ভেজা জায়গা এড়িয়ে শুকনো মাটিতে বসানো হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে খেতের আলে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬২ জন। আগের বছরের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে ১৮৪ শতাংশ। শুধু এপ্রিল মাসের প্রথম ১৭ দিনেই ১৪২ জন নিহত।
পশ্চিমবঙ্গেও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একদিনেই মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২০ জনের। এদের সিংহভাগই কৃষক, যাঁরা খোলা জমিতে বা জলাশয়ে কাজ করছিলেন বজ্রপাতের সময়।
গোসাবার সেই ছোট্ট স্কুল থেকে শুরু হওয়া এই উদ্ভাবনী পথ আজ অনেক বড় সম্ভাবনার দিশা দেখাচ্ছে। যেখানে সরকার বা প্রযুক্তিগত সংস্থার নাগাল পৌঁছায় না, সেখানে এভাবেই ছেলেমেয়েদের হাত ধরে বিজ্ঞান পৌঁছচ্ছে মাঠে। তাদের হাতে তৈরি একেকটি যন্ত্র শুধু জমি নয়, প্রাণও বাঁচাচ্ছে।