কমিশন ও প্রশাসন সূত্রে যে খবর চুঁইয়ে বেরোচ্ছে তা চিত্তাকর্ষক। ভাল মন্দ বিচার পরে। সংখ্যাটাই বড় রকমের তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে সেই প্রসঙ্গে আসার আগে এসআইআর-র (West Bengal SIR) ব্যাপারে আরও একটি খবর আসছে।

জ্ঞানেশ কুমার
শেষ আপডেট: 18 February 2026 15:33
বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন (West Bengal Assembly Election 2026) ঘোষণা হতে এখনও কমবেশি ২০ দিন সময় বাকি। তার আগে এটুকু এখন পরিষ্কার যে ভোটের ভবিষ্যৎ আর শুধু ইস্যুর বেড়াজালে আটকে নেই। বরং অনেক নির্ভর করছে পাটিগণিতের উপর। সেই পাটিগণিতের অঙ্ক সাজাতে যদি শাসক দল তৃণমূলের বড় ভরসা হয় বাংলায় বিপুল সংখ্যালঘু ভোট এবং ভাতা নির্ভর উপভোক্তা শ্রেণি, তেমনই প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তাকিয়ে রয়েছে এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা (West Bengal SIR Final List) প্রকাশের দিকে। মূল কৌতূহল হল, এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে বিধানসভা ভিত্তিতে কত সংখ্যালঘু ভোট (SIR minority Vote West Bengal) শেষমেশ বাদ যাবে।
এ ব্যাপারে কমিশন ও প্রশাসন সূত্রে যে খবর চুঁইয়ে বেরোচ্ছে তা চিত্তাকর্ষক। ভাল মন্দ বিচার পরে। সংখ্যাটাই বড় রকমের তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে সেই প্রসঙ্গে আসার আগে এসআইআর-র (West Bengal SIR) ব্যাপারে আরও একটি খবর আসছে।
উদ্বেগের বিষয়, যে সমস্ত ভোটারের নথি 'ফাউন্ড ওকে' (অর্থাৎ সব নথি যাচাই হয়েছে) করে দিয়েছেন ইআরও-রা, তাঁদের অনেকের নামের ক্ষেত্রে 'টু বি রিভিউড' (অর্থাৎ রিভিউ করতে হবে) করে দেওয়া হচ্ছে রোল অবর্জাভারদের লগ-ইন থেকে। সূত্রের খবর, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নামগুলি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার। ফলত, এইসব নামগুলির ক্ষেত্রে 'ফাউন্ড ওকে' করার পরও ফাইনাল ডিসপোসাল করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া যাচ্ছে না। এখানেই প্রশ্ন - এসআইআরের গোটা প্রক্রিয়া শেষ হতে আর মাত্র কদিন বাকি। তাহলে এই ভোটারদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তাঁদের নাম কি আদৌ ডিসপোসাল করা যাবে?
সূত্রের খবর, একটি জেলায় মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এমন ভোটারের সংখ্যা (টু বি রিভিউড) ছিল দেড় হাজার। তবে বুধবার সকালেই সেই সংখ্যা পৌঁছয় প্রায় ৮ হাজারে! যদিও এই ঘটনা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু এলাকায় হচ্ছে বা সংখ্যালঘুদের নামের ক্ষেত্রেই বারবার 'টু বি রিভিউড' করা হচ্ছে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ সিইও দফতর।
উদাহরণস্বরূপ এক আধিকারিক বলেন, পূর্ব মেদিনীপুরে এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, শেখ রাজেশ আলি নামের একজন ভুবনচন্দ্র বেরা নামের এক ব্যক্তিকে বাবা হিসেবে দেখিয়েছেন কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনও নথিই জমা দেননি। অর্থাৎ প্রমাণ হিসেবে কোনও নথি আপলোড হয়নি তবুও এইআরও সেটিকে 'ফাউন্ড ওকে' করে দিয়েছেন!
সূত্র মারফৎ আরও জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চল বাদ দিয়ে রাজ্যের অন্যান্য জেলার বেশিরভাগ বিধানসভা থেকে এমন ঘটনার খবর আসছে। বিধানসভা প্রতি গড়ে কমবেশি ১০ হাজার এমন ভোটারের সংখ্যা পৌঁছতে পারে।
সংখ্যালঘুদের কিছু পদবী ধরে ধরে ‘সিস্টেম’ প্রশ্ন তুলছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তাও মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতর খারিজ করে দিয়েছে। সিইও মনোজ আগরওয়ালের বক্তব্য, ''এমন কিছু হতেই পারে না। সিস্টেম কী করে বুঝবে কার নাম কী! এতজন অবজার্ভার, মাইক্রো অবজার্ভার কাজ করছেন, এমন যদি হত তাহলে আমাদের নলেজে আসত।'' তবে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে জানিয়েছেন, “যাঁরাই নির্দিষ্ট ১৩টি নথির বাইরে নথি জমা দিয়েছেন কিংবা লিংকড হওয়ার পর প্রমাণ দিতে পারেননি, কেবল তাঁদের ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকার পরও 'ফাউন্ড ওকে' করলে এমন হলে হতে পারে।''
এখন বড় প্রশ্ন হল, শেষমেশ কত সংখ্যালঘু ভোটারের নাম বাদ যেতে পারে?
কমিশন ও রাজনৈতিক সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে প্রথমেই যে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেছে, তার মধ্যে কমবেশি ১৮ লক্ষ ভোটার হলেন সংখ্যালঘু। এই ভোটাররা হয় মৃত বা তাঁরা অন্য কোথাও চলে গেছেন। তাঁদের হদিশ মেলেনি। হিসাব মতো এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু।
বিজেপি আশা করছে, লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি বা অন্যান্য কারণে যে দেড় কোটি ভোটার নোটিস পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যেতে পারে। এবং সম্ভাব্য সংখ্যা যদি শেষমেশ তাই হয়, তাহলে তার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার হতে পারেন সংখ্যালঘুরাই। সেই পরিস্থিতি বাংলায় ভোটের আগে কোনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি করবে কিনা বা তাতে অস্থিরতা তৈরি হবে কিনা তা নিয়েও উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। তবে তেমন পরিস্থিতি হলে তার থেকেও রাজনৈতিক সুবিধা তোলার চেষ্টা করতে পারে গেরুয়া শিবির।
এই সাত সতেরো অঙ্কের মধ্যেই সোমবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে দেখা করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রতি বার দিল্লিতে অমিত শাহর সঙ্গে দেখা করার পরই দৃশ্যত উজ্জীবিত দেখায় শুভেন্দুকে। এবার অন্যথা হয়নি। মঙ্গলবার বীর বিক্রমে মেরুকরণের রাজনীতিতে শান দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, তৃণমূল ভাল করেই বুঝতে পারছে এক টানা ১৫ বছর ধরে সরকারের থাকার পর তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তা সে দুর্নীতির প্রশ্নে হোক বা অনুন্নয়নের বিষয়আশয় নিয়ে। সেদিক থেকে সংখ্যালঘু ভোট যেমন তাঁদের প্রধান বল ভরসা। তেমনই উপভোক্তা ভোটের উপরেও বড় নির্ভরতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তিনটি প্রকল্প নজর করার মতো - বাংলার বাড়ি, লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার ও যুব সাথী। এই তিন প্রকল্পের মোট উপভোক্তার সংখ্যা বাংলার সামগ্রিক ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে শুধু উপভোক্তাদের পাশে ধরে রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে হতে পারে।
এদের পাল্টা লুব্ধ করে বিজেপি অবশ্যই তা কাটার চেষ্টা করবে। তা ছাড়া এই উপভোক্তা শ্রেণির মধ্যে বড় অংশে সংখ্যালঘুও রয়েছে। বিজেপি আশা করছে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটাই ছাঁকনির মাধ্যমে অনেকটা ছেঁকে বেরিয়ে যাবে এবং তাতে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু মিশ্র এলাকায় আগের তুলনায় বিস্তর ফারাক তৈরি হবে। এবং যে সব আসন বিজেপি মার্জিনালি হেরে গেছিল, সেখানে লড়াইয়ে ফিরে আসতে পারবে।
উদাহরণ দিয়ে বলা যায় - ধরা যাক কোনও বিধানসভায় সংখ্যাগুরু এলাকা থেকে ভোট লিড পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ওই বিধানসভায় সংখ্যালঘু এলাকা থেকে তৃণমূল যে বিপুল ব্যবধান তৈরি করে ফেলে তার জেরে আসনটি ২ হাজার বা ৫ হাজার ভোটে জিতে যায়। মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া বা ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার পর এই সব আসনে জবরদস্ত লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করছে বিজেপি।
চুম্বকে এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকার জন্যই এখন অপেক্ষা করে আছে দুই শিবির। ভোটের ভবিষ্যৎ এবার অনেকটাই নির্ভর করতে পারে সেই সংখ্যা ও অঙ্কের উপর।