বিচারহীনতার অভিযোগে শনিবার ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে নাগরিক সমাজ। তাতে উপস্থিত থাকবেন নির্যাতিতার মা-বাবাও। শুক্রবার রাতে শ্যামবাজারের বিক্ষোভে সামিল হয়ে কান্না জড়ানো গলায় তাঁদের আর্তি, “আজও প্রতি রাতে মেয়ের কান্না শুনি। বিচারের জন্য যতদূর লড়তে হয়, লড়ব।"

ফাইল ছবি।
শেষ আপডেট: 9 August 2025 09:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গতবছর ৮ অগস্ট। কলকাতার অন্যতম সরকারি মেডিক্যাল কলেজ আরজি (RG Kar Case) করে টানা ৩৬ ঘণ্টা ডিউটির পর গভীর রাতে ‘চেস্ট ডিপার্টমেন্ট’-এর সেমিনার হলে বিশ্রামে গিয়েছিলেন ৩১ বছরের এক ডাক্তারি ছাত্রী। পরের দিন সকাল ৯ অগস্ট, সেখান থেকেই উদ্ধার হয় তাঁর রক্তাক্ত দেহ। ময়নাতদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য— যৌন নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে তরুণীকে।
প্রথমে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে কলকাতা পুলিশ। পরে ধর্ষণ ও খুনের মামলা রুজু হয়। তদন্তে নেমে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। দাবি করা হয়, সঞ্জয়ই একমাত্র অভিযুক্ত। কিন্তু মৃতার পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ— এটি পরিকল্পিত অপরাধ, আরও কয়েকজন এর সঙ্গে জড়িত, যাদের অনেকেই হাসপাতালের ভেতরের লোক।
দেশজুড়ে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। কর্মবিরতিতে নামেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। আদালতের নির্দেশে তদন্তভার যায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে। ধর্ষণের মামলায় সিবিআই অবশ্য দ্বিতীয় কাউকে গ্রেফতার করেনি। চার্জশিটে সঞ্জয়কেই একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি শিয়ালদহ আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তবে এখানেই থামেনি বিতর্ক।
সিবিআই ও নির্যাতিতার পরিবার সঞ্জয়ের ফাঁসির দাবি জানায়। একই সঙ্গে বাকি অপরাধীদেরও খুঁজে বের করার দাবি জানায় নিহতের পরিবার। অপরদিকে সঞ্জয় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কলকাতা হাইকোর্টে খালাসের আবেদন করেছেন।
ঘটনার পর সেই দিন হাসপাতালের তরফে নির্যাতিতা চিকিৎসকের পরিবারকে তিনবার ফোনে তিন রকম কথা বলা হয়েছিল বলে দাবি। পরে সেই অডিও ভাইরাল হয় (যার সত্যতা দ্য ওয়াল যাচাই করেনি)। সেখানে 'আত্মহত্যা'র প্রসঙ্গও শোনা যায়। এমনকী পরিবারকে প্রথমে দেহ দেখতে না দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা হয় বলেও অভিযোগ। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত না করেই তড়িঘড়ি বডি রিলিজ করা, দ্রুত সৎকার করা-সহ একাধিক ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর পাশাপাশি পুলিশের অতি সক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে নির্যাতিতা চিকিৎসক ছাত্রীর মা-বাবা থেকে মৃতার সহকর্মীদের।
এমন আবহে গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে গিয়ে সিবিআইয়ের ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করেছেন নির্যাতিতা চিকিৎসক ছাত্রীর মা-বাবা। তাঁদের দাবি, কলকাতা পুলিশের ধাঁচেই আসল অপরাধীদের আড়াল করছে সিবিআই। তাঁদের মতে, "এটা শুধুই সঞ্জয়ের কাজ নয়…! এত বড় মেডিক্যাল কলেজে একজন লোক ঢুকে ধর্ষণ করে খুন করে বেরিয়ে গেল? কেউ কিছু জানল না?"
সব মিলিয়ে এক বছর পরেও বহু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘটনার দিন (৯ অগস্ট) কী ঘটেছিল? আসল সত্য কী? তা নিয়ে হাজারও প্রশ্ন রয়েছে জনমানসেও।
ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্টে কী জানিয়েছিল পুলিশ?
ঘটনার পূর্ণ বিবরণ শীর্ষ আদালতে জমা দিয়ে কলকাতা পুলিশ জানিয়েছিল, ৯ অগস্ট
সকাল ১০:১০: টালা থানায় খবর যায়।
১০:৩০: পুলিশ ঘটনাস্থলে।
১১:০০: হোমিসাইড শাখা আসে।
১২:২৫: ভিডিওগ্রাফার আসেন।
১২:৪৪: মেডিক্যাল অফিসার মৃত চিকিৎসকছাত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন।
১:৪৭: ইউডি মামলা রুজু।
৩:৫০: বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ
৪:১০: ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে
৫:১০: দেহ মর্গে পাঠানো
৬:১০ – ৭:১০: ময়নাতদন্ত
৮:০০: ডগ স্কোয়াড ঘটনাস্থলে
৮:৩০ – ১০:৪৫: জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত
১১:৪৫: FIR দায়ের
ওই রিপোর্ট দেখে সে সময় কলকাতা পুলিশের তদন্ত নিয়ে দুটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিল শীর্ষ আদালত।
এক: "ময়নাতদন্তের আগেই কী করে নিশ্চিত হল পুলিশ যে এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু? তা হলে ময়নাতদন্ত কেন?"
দুই: "সকাল ৯টা নাগাদ দেহ উদ্ধারের পর FIR দায়ের হল রাত ১১:৪৫-এ? প্রায় ১৪ ঘণ্টা দেরি! অধ্যক্ষ কেন FIR করলেন না? তাঁকে বাধা দিচ্ছিল কে?"
আরজি করে চিকিৎসক মৃত্যুর খুনের তদন্তের সূত্রেই উঠে আসে দুর্নীতি এবং তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ। যার ভিত্তিতে আরজি করের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার অফিসার ইনচার্জ অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করে তদন্তকারী সংস্থা। অভিজিৎবাবু বর্তমানে জামিনে মুক্ত। অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সময়ে চার্জশিট দাখিল না করার কারণেই নাকি অভিজিৎবাবু জামিন পেয়েছেন।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও যে সব প্রশ্ন সামনে আসছে—সেই রাতের আসল সত্য কি সামনে আসবে? একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার সম্ভাবনা কি খতিয়ে দেখা হবে? প্রমাণ নষ্টের দায়ে দোষীদের শাস্তি হবে তো?
এর মধ্যেই বিচারের দাবিতে অভয়া মঞ্চ ও জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট ৮ অগস্ট রাতভর শ্যামবাজারে মশাল মিছিল, ধিক্কার সভা-সহ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন, "এভাবে বিচার ধামাচাপা দিতে দেব না।"
বিচারহীনতার অভিযোগে শনিবার ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে নাগরিক সমাজ। তাতে উপস্থিত থাকবেন নির্যাতিতার মা-বাবাও। শুক্রবার রাতে শ্যামবাজারের বিক্ষোভে সামিল হয়ে কান্না জড়ানো গলায় তাঁদের আর্তি, “আজও প্রতি রাতে মেয়ের কান্না শুনি। বিচারের জন্য যতদূর লড়তে হয়, লড়ব।"