
শেষ আপডেট: 16 February 2023 10:35
আজকের নষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে (Tulsidas Balaram) ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক এখন। এটাই দস্তুর। ময়দানের। আমি কিন্তু আজও ভুলিনি ১৯৭৮য়ের জুলাইয়ের একটা দিন ফুরনো প্রায়সন্ধের কথা।
আপনার মনে থাকার কথা নয় এটা। মোহনবাগানের একটা লিগ ম্যাচ (football) ছিল মোহনবাগান মাঠে। মহমেডান মাঠে বি এন আর-এরও খেলা ছিল সেদিন। কাছাকাছি সময়ে ভেঙেছিল দুটি ম্যাচ। আপনি ফিরছিলেন সেই ম্যাচ দেখে, মহমেডান মাঠ থেকে। আমিও মোহনবাগানের ম্যাচটা দেখে ফিরছি মোহনবাগান (Mohun Bagan) মাঠ থেকে।
খোলা একটা মাঠে দেখলাম আপনাকে, হেঁটে ফিরছেন। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম আপনাকে। এবং কি আশ্চর্য! আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন "ও মাঠে স্কোর কি?" আমি উত্তর দিলাম "৩-০ গোলে জিতেছে মোহনবাগান।" আপনি "ও আচ্ছা। থ্যাঙ্ক ইউ" বলে হাঁটতে থাকলেন আবার, আগের মত।
আলো কমে আসা ময়দানটা অলৌকিক আলোকময় লাগছিল সেদিন, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে। ৪৪ বছর আগের সেই আশ্চর্য সময়ে আপনি ছিলেন ৪২য়ের টগবগে তরুণ।
ভ্যারাইটি আর ভার্সাটিলিটির প্রতিশব্দ ছিলেন আপনি। ১৯৬১র ইস্টবেঙ্গল অধিনায়ক ছিলেন আপনি ১৯৫৭ থেকে ৪ বছর খেলার পরে। সেবার লিগে ২৩টি গোল ছিল আপনার। ১৯৬২ অবধি আপনি খেলেন ওই ক্লাবে। ১৯৬৩র শুরুতে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ইস্যু আপনাকে অবসর নিতে বাধ্য করে।
তার আগে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে অসংখ্য গৌরবময় মুহূর্তর কারিগর ছিলেন আপনি। আর আপনার জাতীয় দলের হয়ে পারফরমেন্স আজও থেকে গেছে আলোর দিশারী হয়ে।১৯৫৮র টোকিও এশিয়াডে ৩ গোল (বর্মা, হংকং আর ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে), ১৯৫৯য়ের মারডেকা ট্রফিতে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ১ গোল, ১৯৬০য়ের রোম অলিম্পিকে ২ গোল (হাঙ্গেরি ও পেরুর বিরুদ্ধে) আর ১৯৬২র জাকার্তা এশিয়াডে ২ গোল (থাইল্যান্ড আর জাপানের বিরুদ্ধে) করেছিলেন আপনি।
১৯৬২র জাকার্তা এশিয়াডে সোনাজয়ী ভারতীয় দলের অন্যতম প্রাসঙ্গিক ফুটবলার ছিলেন আপনি। আচমকা নেওয়া বাঁক খাওয়া শট, ইম্প্রোভাইজেশন আর অসামান্য ইনসাইড কাটের জন্যই আপনি ভারতের আর বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে থেকে গেছেন।
আপনার সৎসাহস বারবার ভারতীয় ফুটবলে পূজিত হয়েছে। আপনার যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের দুঃসাহসিক প্রবণতা এটা অমোঘ আকর্ষণ ছিল। আপনার কথা মনে পড়া এখনও, আজও এক সব ধোয়ানো আলোর মেলা, এই অন্ধকার ঘিরে ফেলা অসময়ে।
আপনি ময়দানের উপর অবিমিশ্র অভিমানে এখন একান্ত নিজের জগতে থাকতেন উত্তরপাড়ায়, গঙ্গার তীরবর্তী এক ফ্ল্যাটে।যেখানে ফুটবল নেই। যেখানে হয়ত “আপনার ময়দান” ছিল একদিন, ফুটবল না থাকলেও। কিন্তু এই সময়ে দাঁড়িয়ে আর কিছুই ছিল না আপনার কাছে, গঙ্গার হাওয়া আর গঙ্গার ওপারের মন্দিরের দেবীর কাছে সবার ভালর জন্য প্রার্থনা ছাড়া।
অভিমানই তো এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনার একমাত্র সঙ্গী ছিল। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, চুনী গোস্বামী ও আপনি মিলে যে নস্টালজিয়ার ত্রিভুজ আজীবন আমাদের ঘিরে আছে আর থাকবে, তার অন্যতম বাহু আপনার আত্মজীবনী (“বলরাম, The Hero of Indian Football”, লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্যামসুন্দর ঘোষ) প্রকাশের অনুষ্ঠানেও গত সেপ্টেম্বরে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সেই অভিমানের চোখ ভেজানো থ্রু পাস বাড়িয়েছেন আপনি, সবাই দেখেছিলাম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন ফুটবলার সুকুমার সমাজপতি আর বিশ্বজিৎ ভট্টাচাৰ্য। শারীরিক অসুস্থতার জন্য না আসতে পারলেও ভিডিওকলেই আপনার অনাবিল অভিমান সেদিন ঝরে পড়েছিল সবার চোখের সামনে।
দুই বন্ধু পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় আর চুনী গোস্বামী প্রয়াত, আর ভারতীয় ফুটবলে অন্যতম সেরা নক্ষত্র হয়েও আপনি ফুটবল থেকে অনেক দূরে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন ওই অভিমানের কারণেই। অভিমানী আপনি কিছু বলতেন না এসব নিয়ে।শুধু নীরব অভিমানে নিজেকে আরো নিভৃতে ডুবিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন নি আপনি। আপনি থেকে গিয়েছেন ভদ্রতা আর নীরব প্রতিবাদের প্রতিশব্দ হয়েই।
আজ টুক করে সবার অগোচরে ৮৬ পেরনো আপনি জীবনের মাঠ থেকেই সরে গেলেন চিরতরে। কে আর মনে রেখেছে যে ২ মাস ধরে হাসপাতালে ছিলেন? বোধহয় কেউ না। কেউ কি মনে রাখতে পেরেছে যে কলকাতা ময়দানে যৌবনের স্বপ্নের ৬টা বছর (১৯৫৭ - ১৯৬২ ) ছিবড়ে করে দিয়েছিলেন আপনি নিজেকে? বোধহয় অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ না। অথচ আপনি দেখতে পেলেন না, আগামীকালের সব মিডিয়ায় খবরে থাকবেন ৮৬ বছর পেরিয়ে হারিয়ে যাওয়া আপনি। আপনি দেখতে পেলেন না, আপনাকে নিয়ে কি দারুণ স্মরণে মেতে থাকব আমরা আগামী দু এক দিন। তারপর আবার সব “স্বাভাবিক” হয়ে যাবে।
আলবিদা, সুদূর সেকেন্দ্রাবাদ থেকে এসে বেলা পড়ে আসা কলকাতা ময়দানের বিস্ময়কর অনন্ত আলোর মত জ্বলতে থাকা তুলসীদাস বলরাম। কলকাতাই ছিল তাঁর আসল ঘর।
ভাল থাকুন আপনি, আপনার খেলার মতই। কিছু মানুষের মনের তাঁবুতে থেকে গেছেন আপনি, চিরকালীন হয়ে।
পোস্ট অফিসের কিছু সঞ্চয় স্কিমে বাড়তি সুদ কাল থেকে, জেনে নিন বিশদে