কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত কাদাপাড়া বসতি। সরু গলি, কাঁদামাটি আর টিনের ঘর। এখানে থাকে প্রায় তিনশো পরিবার— দিনমজুর, গৃহকর্মী, ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক। কারও স্থায়ী ঠিকানা নেই, কারও আধার কার্ডে বানান ভুল, কারও রেশন কার্ড বাতিল। এখন সবাই বলছে, “SIR করতে হলে কাগজ লাগবে।”

কলকাতার বস্তিবাসী
শেষ আপডেট: 12 November 2025 12:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চারিদিকে এখন একটাই আলোচনা— SIR। কাগজ দেখাতে হবে, নথি জমা দিতে হবে, পরিচয় প্রমাণ করতে হবে— এই বার্তা পৌঁছে গেছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। কিন্তু সমাজের এক প্রান্তে, যেখানে জীবনের প্রতিদিনই বেঁচে থাকার সংগ্রাম, সেখানে এই নির্দেশ যেন এক নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।
কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত কাদাপাড়া বসতি। সরু গলি, কাঁদামাটি আর টিনের ঘর। এখানে থাকে প্রায় তিনশো পরিবার— দিনমজুর, গৃহকর্মী, ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক। কারও স্থায়ী ঠিকানা নেই, কারও আধার কার্ডে বানান ভুল, কারও রেশন কার্ড বাতিল। এখন সবাই বলছে, “SIR করতে হলে কাগজ লাগবে।”
সকালবেলা এখানকার পুরুষেরা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন, মহিলারা যান বাড়ি বাড়ি ঝাড়ু দিতে। দিন শেষে হাতে আসে দুই-একশো টাকা। সেই টাকায় সংসার চলে। এই মানুষগুলোর সময় নেই সরকারি দফতরের লাইনে দাঁড়ানোর, টাকাও নেই নতুন কাগজ তৈরি করার।
একজন বৃদ্ধ দিনমজুর বললেন, “বাবু, আমি কাগজ ঠিক করব না কাজ খুঁজব? যদি একদিন কাজ না করি, ঘরে চুলা জ্বলে না।”
আরেকজন মহিলা বললেন, “আমার ছেলের জন্মসার্টিফিকেট নেই। ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম প্রতিবেশীর ঠিকানা দিয়ে। এখন সবাই বলছে কাগজ লাগবে। আমরা গরিব, আমাদের কাগজ কোথায়?”
কাদাপাড়ার অনেকেই জানেই না SIR আসলে কী। কেউ শুনেছে টিভিতে, কেউ চায়ের দোকানে। কিন্তু স্পষ্ট তথ্য বা সরকারি সহায়তা— কিছুই পৌঁছয়নি এই এলাকায়। এক যুবক বললেন, “যারা অফিসে যায়, তারা জানে কাগজ কোথা থেকে আনতে হয়। আমাদের মতো মানুষের কেউ শেখায় না।”
অন্যদিকে, কিছু এনজিও ও স্থানীয় ক্লাব সচেতনতা শিবির করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সমস্যা বিশাল। বহু মানুষ আছেন, যাদের নথি একেবারেই নেই— জন্মসার্টিফিকেট, ভোটার কার্ড, এমনকি স্থায়ী ঠিকানাও নয়।
এই আতঙ্কের মাঝেই চলছে দৈনন্দিন সংগ্রাম। কেউ কাজ হারিয়েছেন, কেউ ধার করে সংসার চালাচ্ছেন। এখন সেই জীবনযুদ্ধে নতুন শত্রু ‘কাগজ’।
“আমরা দিন আনি, দিন খাই। কাগজ ঠিক করব, না ছেলেমেয়েকে খাওয়াব?” — প্রশ্ন এক শ্রমজীবী মহিলার। সব মিলিয়ে কাদাপাড়ার টিনের ঘরে এখন ভয় আর বিভ্রান্তির ছায়া। মানুষ জানে না ভবিষ্যতে কী হবে, শুধু জানে— বাঁচতে হলে কাগজ লাগবে। কিন্তু সেই কাগজ পেতে হলে যে সময়, টাকা আর শিক্ষা দরকার, তা তাদের নেই।
সরকারি উদ্যোগ যতদিন না এই মানুষদের দরজায় পৌঁছয়, ততদিন এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি নেই। কাগজ গুছোবে, না জীবন গুছোবে — এই প্রশ্নই আজ প্রতিটি ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কাদাপাড়ায়।