ইডেনের মাঠে তাই এই টেস্টের গল্পটা শুধু বল ঘোরানো নিয়ে নয়, স্নায়ুর লড়াইও বটে। কে কতটা ধৈর্য ধরে রাখতে পারে, সামলাতে পারে চাপ—সেটাই ঠিক করবে ম্যাচের ফলাফল।
.jpeg.webp)
প্রোটিয়াদের স্পিনার-ত্রয়ী
শেষ আপডেট: 12 November 2025 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৪ নভেম্বর ইডেন গার্ডেন্সে শুরু হচ্ছে ভারত–দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট সিরিজ। অগ্নিপরীক্ষা শুরুর আগে একটাই প্রশ্ন এখন খুব জোরালোভাবে উঠে আসছে—কিউয়িদের মতো কি ঘূর্ণির জোরে ভারতকে আবার কোণঠাসা করা সম্ভব? স্পিন-বান্ধব বাইশ গজ বানালে কি নিউজিল্যান্ডের মতোই কিস্তিমাত দিতে পারে প্রোটিয়া বাহিনী?
ঠিক এক বছর আগেই ব্ল্যাক ক্ল্যাপসরা যা করে দেখিয়েছিল, তা অনেকের কাছে অলৌকিকই ঠেকে! টানা তিন টেস্টে ভারতকে হারিয়ে হারানো, তাও ঘরের মাঠে, সত্যি বলতে অবিশ্বাস্যই বটে। স্যান্টনার, ফিলিপস আর আজাজ প্যাটেলের স্পিনের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ… ভারতীয় ব্যাটাররা কার্যত হাঁসফাঁস করছিলেন। এখন, অন্তিম মুহূর্তের প্রস্তুতি বদলে না গেলে, দক্ষিণ আফ্রিকা ঠিক একই ছকে খেলতে চায়।
অধিনায়ক তেম্বা বাভুমা আগেই জানিয়েছেন, তাঁদের পরিকল্পনাটা স্পষ্ট—স্পিন দিয়ে চাপ তৈরি করা। আর তার জন্য স্কোয়াডে আছেন তিন অভিজ্ঞ ঘূর্ণি বোলার: কেশব মহারাজ, সাইমন হার্মার ও সেনুরান মুথুসামি। যাঁরা ধীরে টার্ন করা পিচে দীর্ঘ স্পেলে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে জানেন।
প্রথম ম্যাচ ইডেন গার্ডেন্স। যেখানে ঐতিহাসিকভাবে তৃতীয় দিন থেকে ধীরে ধীরে বল ঘুরতে শুরু করে। প্রথম দু’দিন ব্যাটিং সহজ হলেও পরে পিচ মন্থর হয়ে দাঁড়ায়। বল থামে। আর তখনই স্পিনারদের বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সুযোগ। মহারাজ–হার্মাররা জানেন, এই ধরণের পিচে একবার টার্ন পেলে ব্যাটসম্যানদের টিকে থাকাই কঠিন পরীক্ষা।
পাকিস্তান সফরে প্রোটিয়া শিবিরের ঘূর্ণি বোলারদের পারফরম্যান্স খারাপ ছিল না। হার্মার এক ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন, মুথুসামি ১১ আর মহারাজের ৭। যা টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসার জায়গা। তাই তাঁদের আত্মবিশ্বাসও বেশ চওড়া।
ভারতের মাটিতে টেস্ট জেতা কারও জন্যই সহজ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতে শেষ ২০ বছরে জিতেছে হাতেগোনা কয়েকটি ম্যাচ। কারণ, এখানে শুধু বল ঘোরা নয়—চাপটা অন্যরকম। দর্শকের গর্জন, ধৈর্যের পরীক্ষা, প্রতিদিনের পরিবর্তনশীল উইকেট—সব মিলিয়ে ভয়ানক মানসিক টানাপড়েন।
তার উপর ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিনের বিপক্ষে দারুণ খেলেন। রোহিত শর্মা, শুভমান গিল, শ্রেয়স আইয়ার বা কেএল রাহুল—প্রত্যেকেই জানেন কীভাবে বলের লাইন ধরে খেলতে হয়। তাই শুধু ঘূর্ণি দিয়ে এই ব্যাটিং লাইন-আপকে ভাঙা সহজ নয়।
ইডেনের পিচ যদিও ‘স্পোর্টিং’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তবু ভারতীয় মাটিতে তৃতীয় দিন থেকে বল টার্ন করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর ঠিক তখনই আসল পরীক্ষা শুরু—দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনাররা কি চাপ ধরে রাখতে পারবেন? নাকি ভারতীয় ব্যাটাররা পাল্টা আক্রমণ শানাবেন?
নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের দাগ এখনও মোছেনি। সেই ব্যর্থতার পর এবার ভারতের লক্ষ্য শুধু সিরিজ জয় নয়, ঘরের মাঠে পরাজয়ের ট্রমা পাকাপাকিভাবে মুছে ফেলা। শুভমানদের কাছে এটা যেন একরকম ‘রিডেম্পশন সিরিজ’—নিজেদের ডেরায় আধিপত্য ফের নতুন করে জাহিরের সুযোগ।
তাই ভারতের পরিকল্পনা স্পষ্ট। প্রথম ইনিংসে বড় রান তুলতে হবে, যাতে ম্যাচের চাপ নিজের হাতে রাখা যায়। তারপর স্পিনারদের মাঠে নামিয়ে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে বন্দি করে ফেলা। এর জন্য প্রথমেই দরকার ভারসাম্য। কেবল স্পিনে ভরসা রাখলে বিপদ। তাই পেস আক্রমণ—রাবাডারা যদি শুরুতেই দু-একটা উইকেট ফেলে দিতে পারেন, তাহলেই মহারাজ–হার্মারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে উঠবে।
তাই স্পিনারদের লক্ষ্য ধৈর্য ধরে বল করা। উইকেট পাওয়ার লোভে বেশি ঘোরাতে গেলে ব্যাটসম্যানরা সুযোগ পাবে পাল্টা আঘাতের। এতে যে টিম ইন্ডিয়া ভয়ানক হয়ে ওঠে, সেটা আগের অনেক দলই বুঝেছে। প্রোটিয়ারা এই বিষয়ে আগাম সতর্ক হয়েই মাঠে নামতে চাইবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে প্রভূত অস্ত্র—অভিজ্ঞ স্পিনার, জোরালো পরিকল্পনা, তীব্র আত্মবিশ্বাস। কিন্তু ভারতের মাটিতে ঘূর্ণি সবসময় ‘দু’ধারী তলোয়ার’। আজ যদি সেটা বিপক্ষকে আঘাত করে, কাল সেটাই নিজেদের গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। ইডেনের মাঠে তাই এই টেস্টের গল্পটা শুধু বল ঘোরানো নিয়ে নয়, স্নায়ুর লড়াইও বটে। কে কতটা ধৈর্য ধরে রাখতে পারে, সামলাতে পারে চাপ—সেটাই ঠিক করবে ম্যাচের ফলাফল। ফলে নিউজিল্যান্ডের মতো ঘূর্ণির ফাঁদে ভারতকে আটকানো কি দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষেও সম্ভব? উত্তর মিলবে কয়েকদিনের মধ্যেই, ইডেনে পর্দা উন্মোচনের পর!