
শেষ আপডেট: 3 November 2023 14:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: বাড়িতে দুষ্টুমি করে ৯ বছরের শিশু। শিশুকে বাগে আনতে সাধুবাবার পরামর্শে গভীর রাতে তাকে দামোদরের নির্জন চরে ছেড়ে আসার অভিযোগ উঠল বাবা-মা ও দাদুর বিরুদ্ধে। অন্ধকারে বাবা-মাকে দেখতে না পেয়ে কান্না জুড়ে দেয় শিশুটি। কান্নার শব্দ পৌঁছয় স্থানীয় বাসিন্দাদের কানে। তাঁরাই শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে শিশুটিকে নিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির হাতে তুলে দেয়। বাবা-মা এর উপর আস্থা রাখতে না পেরে শিশুটিকে সিঙ্গুরের একটি হোমে পাঠায় শিশু কল্যাণ কমিটি।
শিশুটির বাবা, মা ও দাদুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শিশুটির দাদুর বাড়ি মেমারি থানার পালশিটে। চাকদহ থানার নরেন্দ্রপল্লির কদমতলায় শিশুটির বাবা-মা থাকে। রায়না থানার সুদর্শনপুরের সাধুর আশ্রম থেকে বুধবার রাতে শিশুটির বাবা ও মাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে আশ্রম লাগোয়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় দাদুকে। শিশুদের উপর নির্যাতন ও জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করেছে থানা। ধৃতদের বৃহস্পতিবারই বর্ধমান সিজেএম আদালতে পেশ করা হয়। শিশুটির বাবাকে ৭ দিন নিজেদের হেফাজতে নিতে চেয়ে আদালতে আবেদন জানায় পুলিশ। তাকে ২ দিন পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন ভারপ্রাপ্ত সিজেএম। বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়ে শনিবার শিশুটির মাকে ফের আদালতে পেশের নির্দেশ দেওয়া হয়। বয়সের কথা বিবেচনা করে ডাকামাত্র তদন্তকারী অফিসারের কাছে হাজিরা ও তদন্তে সবরকম সহযোগিতার শর্তে ৭২ বছরের বৃদ্ধ দাদুর জামিন মঞ্জুর করেন ভারপ্রাপ্ত সিজেএম।
পুলিশ জানিয়েছে, ৯ বছরের শিশুটি বাড়িতে খুব দুষ্টুমি করে। তাই তাকে সুদর্শনপুরে এক সাধুবাবার কাছে নিয়ে আসে তার বাবা-মা। আগে একবার শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই সাধু তাকে ভাল করে বলে তাদের বিশ্বাস। তাই এবার দুষ্টুমি বন্ধ করতে শিশুটিকে ফের সাধুবাবার কাছে নিয়ে যান তাঁরা। সাধুবাবা শিশুটিকে নির্জন জায়গায় ছেড়ে আসার নিদান দেন। সেইমতো রাতেই রায়না থানার শিয়ালি বাজার এলাকায় শিশুটিকে ছেড়ে দিয়ে তার বাবা মা আশ্রমে চলে আসে। বাবা-মার খোঁজে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় শিশুটি। এরপর সে কান্না জুড়ে দেয়। কান্না শুনে আশেপাশের লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করেন। বাবা-মাই তাকে ছেড়ে দিয়ে গেছে একথা শিশুটির থেকে জানার পরেই পুলিশ খবর দেন বাসিন্দারা।
তৃতীয় শ্রেণির ওই ছাত্র এরপর পুলিশকেও জানিয়েছে, আশ্রমের সাধুর কথাতেই তার বাবা, মা ও দাদু নদীর পারে তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল। পুলিশ ওই আশ্রমে খোঁজ নিতে গেলে বাধা পায়। পুলিশের দাবি, আশ্রমের মহিলা ভক্তরা তাদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখেছিল। পরে আরও পুলিশ গিয়ে শিশুটির মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে রায়না থানায় নিয়ে আসে। ওই মহিলা পুলিশকে জানায়, বেশ কয়েকবার আশ্রমের জন্যেই তাঁদের ছেলে বিপদের হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে। ছেলে দিনের পর দিন চঞ্চল হয়ে উঠছে, তা শোধরানোর জন্যেই তাঁরা ফের আশ্রমে এসেছিলেন। নদীর পাড়ে ছেলে রাত কাটালে নাকি তার দুষ্টুমি কমে যাবে, সে কথা শুনেই বিশ্বাস ভরে ছেলেকে নদীর ধারে রেখে দিয়ে চলে এসেছিলেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ওম প্রকাশ সিং বলেন, “বাচ্চারা এই বয়সে চঞ্চল হবেই। বাড়াবাড়ি কিছু হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার সমাধানও আছে। কিছু কিছু মানুষ আস্থা নিয়ে এইসব সাধুদের কাছে যায়। আমাদের এই কুসংস্কার থেকে বের হতে হবে।” পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের বর্ধমান শাখার কার্যকরী সভাপতি চন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বলেন, শিশুদের মন সবসময় চঞ্চল প্রকৃতির হয়। অন্ধবিশ্বাসের কবলে পরে সমস্যা আরও জটিল হয়। আসলে এগুলো একটা মানসিক বিকার। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।” পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাজি জানান, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। এলাকায় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হবে।