কালীগঞ্জের ভোটগণনার দিনই তৃণমূলের (TMC) বিজয়মিছিল থেকে বোমা ছোড়ায় মৃত্যু হয়েছে ১০ বছরের নাবালিকার (Minor Girl Death)। মর্মান্তিক এই ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের বক্তব্য আলাদা আলাদা হলেও অবস্থান এক।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 June 2025 19:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: "কেউ বলছেন তৃণমূল আবার কোনও রাজনৈতিক দল হল নাকি? ওটা তো গ্যাং", কারও বক্তব্য, "মিছিলে আবির নিয়ে বিজয়োল্লাস করা হয় জানতাম, কিন্তু বোমা? ভাবা যায় না!" কেউ আবার দায় চাপাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের উপর। কালীগঞ্জের ভোটগণনার (Kaligunj By Election) দিনই তৃণমূলের (TMC) বিজয়মিছিল থেকে বোমা ছোড়ায় মৃত্যু হয়েছে ১০ বছরের নাবালিকার (Minor Girl Death)। মর্মান্তিক এই ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের বক্তব্য আলাদা আলাদা হলেও অবস্থান এক।
ঘটনা হল, উপনির্বাচনে জয় নিশ্চিত হতেই বিজয়মিছিল বার করেন কালীগঞ্জের তৃণমূল নেতারা। সেখানকার মেলেন্দি এলাকায় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই মিছিল থেকে বোমা ছোড়া হয় সিপিএম সমর্থকদের বাড়ি লক্ষ্য করে। বাড়ি ফেরার পথে ওই বোমার আঘাতেই আহত হয় ক্লাস ফোর-এর ছাত্রী। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই মৃত্যু হয় তামান্না খাতুনের। যা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা।
I am shocked and deeply saddened at the death of a young girl in an explosion at Barochandgar in Krishnanagar police district. My prayers and thoughts are with the family in their hour of grief.
Police shall take strong and decisive legal action against the culprits at the…— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) June 23, 2025
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Mamata Banerjee) কালীগঞ্জের ঘটনায় উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। যদিও সিপিএম (CPIM) নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের প্রশ্ন, "উনি তো পুলিশমন্ত্রী। পুলিশকে বোম মারুন বলে যে অনুব্রত ছাড়া পেয়ে গেছেন সেই পুলিশের কি বোমা মারা কর্মীদের ধরার সাহস হবে?" তাঁর কথায়, "বিগত কিছুদিন ধরে বাংলায় হিন্দু-মুসলমান ঝগড়া বাঁধানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে বিজেপি। তাতে ভোটে লাভ হয়েছে তৃণমূলের। আসলে তৃণমূল কাদের, কোন শক্তিকে বিপদ মনে করে সেটা তৃণমূলের বিজয় মিছিল থেকে সিপিএম সমর্থকের বাড়িতে বোমা ছোড়া, তাতে বাচ্চাটির মৃত্যুর ঘটনায় আবার বোঝা গেল। মুখ্যমন্ত্রী পদক্ষেপের কথা বলছেন, এদিকে সুদীপ্ত গুপ্ত থেকে শুরু করে আনিস খানের মৃত্যু, সব ক্ষেত্রেই তিনি টাকা দিয়ে পরিবারকে কিনতে চান। কিন্তু এই প্রাণগুলো কি ফিরবে? নির্লজ্জ শাসকদল, হিংসাত্মক শাসকদল। বাংলার রাজনীতির পরবেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আজকের ঘটনার রক্তের দাগ তাঁর হাতেও লেগে আছে।"
বামনেতা শতরূপ ঘোষের (Shatarup Ghosh) বক্তব্য, "যে ভোটাররা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের দায়ী করা যায় না। কিন্তু সত্যিই যাঁরা কালীগঞ্জের তৃণমূলকে ভোট দিলেন তাঁরা রাস্তাঘাট, জল এসব পাবেন কিনা জানা নেই, কিন্তু একটা বাচ্চার লাশ পেয়ে গেলেন। এভাবেই যদি মানুষ শান্তিতে থাকেন তো ভাল।"
কালীগঞ্জের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) জানিয়েছেন, "একটা উপনির্বাচনে বোমায় একজন শিশুর মৃত্যু হল। এটা থেকে পরিষ্কার যে আসন্ন যে বিধানসভা নির্বাচন তাতে কত লাশ পড়তে পারে। আমরা নির্বাচন কমিশনকে পুরোটা দেখতে বলবো।" পাশাপাশি তিনি এও বলেন, "আসলে কালীগঞ্জের নির্বাচনের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে, যে তৃণমূল জিতলে এই রাজ্যে লাশের পর লাশ পড়বে। আশা করব কমিশন, রাজ্য প্রশাসন দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।" যদিও তাঁর আশঙ্কা, বাদবাকি ঘটনার মতো এক্ষেত্রেও রাজ্যের পুলিশ উদাসীন থাকবে এবং সবটাই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করে বলা হয়েছে, "কালীগঞ্জ থানা এলাকায় বিস্ফোরণে জখম হয়ে ১৩ বছরের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।"
কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর (Adhir Chowdhury) বক্তব্য, "এই নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস একসঙ্গে লড়াই করেছে। সকলেরই জানা ছিল নির্বাচনে তৃণমূল জিতবে। কিন্তু জেতার পরিণামে এরকম একটা ভয়ঙ্কর বাতাবরণ তৈরি হবেসেটা নিশ্চয়ই কেউ আশা করেনি। আমরা জানতাম মানুষ জিতলে আনন্দ করে। কিন্তু এরা দেখছি বদলা নেয়। যারা ভোট দেয়নি তাদের উপর হামলা করল। একটা হ্যান্ডগ্রেনেডে ১০ বছরের শিশুর মৃত্যু হল। এটাই বাংলায় তৃণমূলের গণতন্ত্রের চেহারা।"
ঘটনা প্রসঙ্গে কংগ্রেস নেতা সুমন রায়চৌধুরী দ্য ওয়ালকে বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস কোনও রাজনৈতিক দল নয়। এটা একটা গ্যাং। গ্যাং থাকলে বিশৃঙ্খলা হবেই। বিশৃঙ্খলা হলে মানুষের মৃত্যু ঘটবেই। আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নির্বাচনে প্রহসন করবে এটাই স্বাভাবিক। আজকেও তার প্রমাণ দিলেন।"
আইএসএফ বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকি অবশ্য গোটা ঘটনার দায় ঠেলেছেন নির্বাচন কমিশনের উপর। তাঁর বক্তব্য, একটামাত্র উপনির্বাচন, সেটাও শান্তিতে করাতে পারল না কমিশন ও যিনি সরকারে আছেন তাঁর দল। কমিশনকে তাঁর পরামর্শ, ভবিষ্যতে যাতে এমন কোনও ঘটনা না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এদিকে মুখ্যনির্বাচনী আধিকারিক অর্থাৎ সিইও মনোজকুমার আগরওয়াল একপ্রকার দায় ঝেড়ে দ্য ওয়ালকে জানান, এরকম কোনও বিজয়মিছিল যে হচ্ছে তাই তিনি জানতেন না, খবর ছিল না। জানান, "ইতিমধ্যেই আমি রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছি।" তবে কি না বলে-কয়ে বিজয় মিছিল করার জন্য কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে? তাঁর সাফাই, বিজয়মিছিল বা এ সমস্ত বিষয়ের অনুমতি নেওয়ার জন্য সিইও অফিসকে জানানো হয় না, জেলাপুলিশ বা জেলাশাসকের কাছে অনুমতি নেওয়া হয়। আমি ইতিমধ্যেই রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছি, যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।"
ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন কালীগঞ্জের জয়ী তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদও। তিনিও দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন। বস্তুত, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কালীগঞ্জে জয়ী হয়েছিলেন নাসিরুদ্দিন (লাল) আহমেদ। তাঁর মৃত্যুতে উপনির্বাচন হয় এই কেন্দ্রে। সেই উপনির্বাচনে ৪৯,৭৫৫ ভোটে জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থী তথা নাসিরুদ্দিনের কন্যা আলিফা। আর ভোটগণনার দিনেই কালীগঞ্জে শোকের ছায়া। যা নিয়ে তৃণমূলবিরোধীদের অবস্থান এক।