
শেষ আপডেট: 5 January 2023 05:27
সোমবার নজরুল মঞ্চে তৃণমূলের নতুন কর্মসূচি (program) ঘোষণা হতেই শুভেন্দু অধিকারী, সুজন চক্রবর্তীরা (opposition leaders) হাসাহাসি করতে নেমে পড়েছেন। ‘দিদির দূত’কে (Didir Doot) কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলছেন, দিদির ভূত! সুজনও তেমনই কিছুটা একটা মানে করতে চেয়েছেন। নিজেরাই বলছেন, নিজেরাই হাসছেন। অনেকটা সুকুমার রায়ের সেই ছড়ার মতো—‘ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেলছি হেসে ফ্যাক করে!’
কিন্তু কৌতূহলের বিষয় হল, মুখের উপর চওড়া যে হাসি, তা ভিতরে ভিতরেও কি ততটাই আহ্লাদী? নাকি উদ্বেগের স্রোতও বইছে?
সোমবার তৃণমূল যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দিদির সুরক্ষা কবচ’। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ছোটরা এই নাম দিয়েছে। আসল ব্যাপারটা হল, মানুষের দরজায় তৃণমূল। সরকার যে সুবিধা গ্রাম-শহরের গরিব ও প্রান্তিক মানুষকে দিচ্ছে, সেগুলি নিয়েই মানুষের দরজায় যাবেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।
এ হল টিপিক্যাল কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার বা আস্থা বর্ধক কর্মসূচি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যদি কোনও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েও থাকে, তা হলে তা দূর করার চেষ্টা।
প্রশ্ন হল, শুভেন্দু বা সুজনরা কি সেটা বুঝছেন না? নিশ্চয়ই বুঝছেন। এবং তাঁরা বিরোধী দল হিসাবে গোটা বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি করে এ ব্যাপারে সাধারণের ধারণাকে একটা আকার দিতে চাইছেন। শুভেন্দু বলছেন, যে ভূতেরা সাদা খাতায় পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিল, তারাই আসবে দূত হয়ে। আর সুজন বলছেন, কে কাকে সুরক্ষা দেবে বুঝতে পারছি না। দিদি সুরক্ষা দেবেন, নাকি দিদির সুরক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা।
কিন্তু একটু মন দিয়ে দেখলে দেখা যাবে, গোটা কর্মসূচির নেপথ্যে সুচিন্তিত ভাবনা রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই নীল নকশায় পুরোদস্তুর সিগনেচার দেখা যাচ্ছে অভিষেকের। তা হল, পঞ্চায়েত ভোটের আগে নেতা, মন্ত্রী, কর্মী, সব মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক তৃণমূল ক্যাডারকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া। আরও নির্দিষ্ট করে বললে বুথমুখী করা।
দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক সেদিন দাবি করেছেন, অন্তত সাড়ে তিন লক্ষ ভলান্টিয়ার ‘দিদির দূত’ হয়ে দু’কোটি বাড়িতে পৌঁছবে। অর্থাৎ বুথপিছু গড়ে প্রায় পাঁচ জন করে কর্মীকে নামাবে তৃণমূল।
এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য, দু’মাস আগে ফিরে যাওয়া যাক। যখন ভোটার তালিকার সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ চলছিল, তখন নির্বাচন কমিশন নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটা রবিবারকে বিশেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই দিনগুলোয় প্রতিটি দলের বুথ লেভেল এজেন্টরা গিয়ে সংশ্লিষ্ট বুথে কার নাম উঠবে, কে এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন, কে মৃত— এসব নিয়ে নিজেদের মত লিখিতভাবে জমা দিতে পারতেন।
কিন্তু কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, বেলপাহাড়ি থেকে বসিরহাট— দেখা গিয়েছে তৃণমূল থাকলেও অন্য দল খুব একটা নেই। বিজেপি উত্তরবঙ্গে কিছুটা ছিল। কলকাতা, হাওড়া, হুগলিতে তবু চোখে দেখা গিয়েছিল সিপিএমকে। কিন্তু বাকি জায়গায় কেউ ছিল না। কেউ না। তৃণমূল কিন্তু ছিল প্রায় সব বুথে।
সাধারণত ডানপন্থী দলে সারা বছর বুথের সংগঠন থাকে না। ভোটের সময়ে তা গড়ে ওঠে। বিজেপি এ ব্যাপারে আলাদা। কারণ তারা ক্যাডারভিত্তিক দল। আর বাংলায় সিপিএম যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন লালপার্টির বুথ কমিটির সংগঠন ছিল অতীব মজবুত। একটা সময় বুথ কমিটির কনভেনরদের সাংগঠনিক দক্ষতা বোঝাতে গিয়ে সিপিএমের প্রয়াত রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস বলতেন, ‘রবিবার এলাকায় কোন বাড়িতে পাঁঠা হচ্ছে আর কোন বাড়িতে ডিমের ঝোল— সেটা আমাদের লোক বলে দিতে পারবে।’
তৃণমূলের মতো একটা দল যে এইভাবে বুথভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, সেটাকেই অন্য ঘরানা হিসেবে দেখতে চাইছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।
এখন ব্যাপার হল, তৃণমূলের এই সাড়ে তিন লক্ষ ভলান্টিয়ার দিদির দূত হয়ে দরজায় দরজায় গিয়ে কী করবেন? অভিষেক ও মমতা স্পষ্টই জানিয়েছেন, সামাজিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে সরকারের যে অজস্র প্রকল্প রয়েছে, তাতে কারা সুবিধা পাচ্ছেন আর পাচ্ছেন না তা সমীক্ষা করবেন ভলান্টিয়াররা। এখানে একটা প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি মানুষের কাছে সরকারি প্রকল্প পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুধুমাত্র সরকারি পরিকাঠামো ও পদ্ধতি দিয়ে করা যাচ্ছে না? এ ব্যাপারে অনেকে বলছেন, সরকারের কাজের ফাঁক পূরণে সংগঠনকে নামাচ্ছে তৃণমূল।
এরপরে কথার পিঠে কথা আসতে পারে, এটা কি খুব অন্যায়? নাকি তৃণমূলই প্রথম এই মডেল আনল? কয়েক দশক পিছনে গেলেই দেখা যাবে এ ব্যাপারে সিপিএম একই মডেলে হেঁটেছিল বাংলায়। অপারেশন বর্গা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কৃষকসভাই ছিল জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙারদের হাতিয়ার। তারপর সাক্ষরতা অভিযানের ক্ষেত্রেও একই জিনিস করেছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। সেই সময়ে সিপিএম পার্টিতে একটি গণসংগঠনই তৈরি করে ফেলেছিল, যার নাম বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি।
অভিষেকের সংগঠন করার যে ধারা তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট, তা হল তিনি সারা বছরের পার্টি সংগঠন চান, মরশুমি নয়। এই ৩৬৫ দিনের পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার জন্য অভিষেক যা যা করছেন বা সাম্প্রতিক সময়ে যা যা করেছেন, তাতে এও সাদা চোখে দেখা গিয়েছে যে, সংগঠন নির্মাণের ধ্রুপদী ঘরানাতেই আস্থা রাখছেন তিনি। অর্থাৎ বুথ সংগঠন। যেটা নতুন সেটা হল, এই সমগ্র ব্যাপারটায় একটা পেশাদারী মোড়ক। অর্থাৎ ধ্রুপদী ধাঁচের সঙ্গে প্রযুক্তি, পেশাদারিত্ব মিশিয়ে দিয়ে একটা ফিউশন তৈরি করার চেষ্টা। যা আগে বাংলায় সেভাবে দেখা যায়নি। এটা হয়তো সময়েরই দাবি।
বিরোধী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ আলোচনায় গত কয়েক বছরে একটা বিষয় বারবার উঠে এসেছে। তা হল, দুর্বল বুথ সংগঠন। আজকে কলকাতায় যদি সিপিএম বা বিজেপি কেন্দ্রীয় জমায়েত ডাকে তাহলে হয়তো রাস্তাঘাট ছাপিয়ে যাবে, কিন্তু কাল যদি ভোট হয়? অনেকের মতে, সব বুথে এজেন্ট বসানোর মতো লোক খুঁজে পাবে না বিরোধী দলগুলি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিষেক হয়তো বিরোধীদের এই দুর্বল জায়গাটাতেই আঘাত হানতে চেয়েছেন। বিরোধীদের এক বা শূন্যের বিরুদ্ধে নিজেদের চার বা পাঁচ জনকে নামিয়ে দেওয়াই হয়তো তাঁর কৌশল। ফুটবলে বহু কোচ এই নিউমেরিক্যাল সুপ্রিমেসির ছকে খেলেন। এর মধ্যে সমান্তরাল দু’টি দিক রয়েছে। এক, সংগঠনকে চাঙ্গা করা এবং দুই, পার্টিকে সরকারি কর্মসূচি নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তৃণমূল এই কৌশলে ভোটে সুফল পাবে কিনা তা সময়ই বলবে। তবে অতীতে দেখা গিয়েছে, দিদিকে বলো, পাড়ায় সমাধান, দুয়ারে সরকারের মতো সাংগঠনিক ও সরকারি কর্মসূচি তৃণমূলকে ডিভিডেন্ট দিয়েছে। আরও একটা বিষয় স্পষ্ট, তা হল মাটির সংগঠনে বিরোধীদেরকে একেবারে কোণঠাসা করে দেওয়া।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, হতাশায় অনেক সময়ে হাসি আসে। কিন্তু তার আবডালে থাকে আসলে মহাশূন্যতার নিদারুণ অনুভূতি। তা থেকেই শুভেন্দু-সুজনদের কি এই হাসি? সেই উত্তরও নিহিত আছে সময়ের গর্ভেই।
বিজেপিতে গৃহদাহ! শুভেন্দুর ডিসেম্বর বিপ্লব দলেই ধাক্কা খাচ্ছে কেন?