
শেষ আপডেট: 5 June 2023 10:54
এই মুহূর্তে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ রয়েছে ভারতে। কিন্তু পৃথিবীর মোট স্বাদু জলের (Water) মাত্র ৪ শতাংশ আছে এ দেশে! খোদ বিশ্বব্যাঙ্ক এই তথ্য জানিয়ে বলেছে, 'যার ফলে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম জলসংকটে থাকা —'ওয়াটার স্ট্রেসড'—দেশ (Water)!' দেশের ১৬ কোটি মানুষ বছরের একটা বড় সময় তীব্র জলসংকটের মধ্যে থাকেন। ২১ শতাংশ ছোঁয়াচে রোগের জন্য দায়ী জলদূষণ। দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু আসতে একটু বেগড়বাঁই করলেই অনাবৃষ্টিতে তরতর করে নামতে থাকে জলস্তর। জলাধার দেখে চিন্তার ছায়া নেমে আসে প্রশাসনের কর্তা থেকে সাধারণ চাষি—সকলের মুখে।
অনাবৃষ্টি, নদীর দূষণ, জলাধারে জল নেমে যাওয়া— একের পর এক সমস্যা দেখে এবার সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে ভূগর্ভস্থ জলের দিকে। খোঁড়া হচ্ছে অতি-গভীর 'পাম্প', তার জল চলে যাচ্ছে শহরের বহুতল অট্টালিকা থেকে গ্রামের চাষের জমি সর্বত্র! কতটা বিপদ ডেকে আনছে এটা?

প্রশ্ন শুনে খানিক থমকালেন অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় (Abhijit Mukherjee)। আইআইটি খড়্গপুরের (IIT-KGP) ভূতত্ত্বের অধ্যাপক, এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম শীর্ষ জল-বিজ্ঞানী। জল-সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলের রাসায়নিক ও ভৌত চরিত্র বিশ্লেষণে অসাধারণ অবদানের জন্য দেশে-বিদেশে পরিচিত মুখ, পেয়েছেন বিজ্ঞান-সাধনায় ভারতের সর্বোচ্চ 'শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার'। রবিবার মধ্য কলকাতার পাঁচতারা হোটেলে একটি বেসরকারি সংস্থার অনুষ্ঠানের ফাঁকে একান্তে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিল দ্য ওয়াল। বললেন, 'দেখুন, এই মুহূর্তে ভূগর্ভস্থ জলের উত্তোলন সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় ভারতে। আর এটা আজকের ব্যাপার নয়। মোটামুটি পুরো সভ্যতার ইতিহাসেই ভারত এই জায়গাটায় রয়েছে। ভূগর্ভস্থ জল হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। ওটা আর ফিরে আসবে না। সবচেয়ে বড় কথা কী জানেন? শুধু ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, যেভাবে ভূগর্ভস্থ জল তোলা হচ্ছে, তাতে এই জল সম্ভবত আর তিরিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যে পেট্রোলিয়ামের চাইতেও তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে পারে!'
শুনলে খানিক হৃৎকম্প হয় বৈকি। অভিজিৎবাবুর পরের কথাগুলোতে কার্যত সেটা আরেক ধাপ বেড়ে যেতে পারে।
'এতে বিপদটা আরও বাড়বে, কারণ যে জলটা তোলা হচ্ছে, তার বেশিরভাগ, মানে প্রায় আশি শতাংশ জলটাই তোলা হচ্ছে চাষের কাজে। অর্থাৎ, এটা কিন্তু শুধু জল নয়। এটা ভারতবর্ষের বেশিরভাগ মানুষের মুখের খাবারও। সমস্যাটা হচ্ছে, জল তো বিনা পয়সাতেই মেলে, আর সরকারও মোটামুটি ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহারকে প্রোমোটই করে! ফলে যেখানে জল বেশি ছিল, সেই জায়গাটাও র্যাপিড জল তোলার ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে।'

মাটির তলার জলের পাশাপাশি গোটা দেশের চাষের কাজ যদি কোনও একটা ভৌগলিক ঘটনার দিকে তাকিয়ে থাকে, সেটা হল বর্ষা। কার্যত দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর কেরলে ঢোকার ওপর ভিত্তি করেই সারা দেশের বর্ষার পূর্বাভাস দেয় মৌসম ভবন। নির্ধারিত অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির আশঙ্কা। এল নিনো বা অন্য কোনও কারণে ভারত মহাসাগরে কিঞ্চিৎ গড়বড় হলেই বাড়তে থাকে আশঙ্কা। ফলে খাল কেটে, জলাধার বানিয়ে নানা 'ব্যাক আপ' পরিকল্পনা করা হয়, যাতে বর্ষার মতিগতি খারাপ হলেও কাজ চালানো যায়। কিন্তু তাতে কতটা লাভ হচ্ছে?
অভিজিৎবাবুর কথায়, 'আসলে খাল বা ক্যানাল ইরিগেশন ব্যবস্থাটা কোনও সমাধান নয়, উল্টে যেটা হয়েছে, সেটাকে প্রায় 'ব্যাকফায়ার করেছে' বলা যায়। ব্রিটিশ আমল থেকে এই খাল ব্যবস্থার ওপর প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পরেও সরকারি উদ্যোগ অঢেল হয়েছে। কিন্তু কী বলুন তো, ক্যানাল সেখানেই কাজ করবে, যেখানে এটা গিয়ে পৌঁছবে। যাকে বলে 'হিন্টারল্যান্ড'। সেদিক দিয়ে দেখলে ভূগর্ভস্থ জল কিন্তু একেবারে সবার নাগালের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য কোনও চেষ্টাই করা হয়নি বহুদিন।'

সরকারি নীতি বা প্রকল্পের ওপর দেশের জল-ছবির অনেকটাই নির্ভর করে। অভিজিৎবাবুদের গবেষণায় ধরা পড়ে, ২০০৫ সালে তৎকালীন ইউপিএ জমানায় মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে শুরু মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীন রোজগার গ্যারান্টি প্রকল্প বা 'মনরেগা' প্রকল্প ভূগর্ভস্থ জলের সংরক্ষণে অনেকটা সাহায্য করেছিল। 'একশো দিনের কাজ' বলে পরিচিত এই প্রকল্পের বিস্তারিত খতিয়ে দেখে ২০১৭ সালে তাঁরা দেখান, আদতে এটা ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। 'মন কি বাতে' তাঁদের কথার উল্লেখ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। 'দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে এই যে জলের শোষণ চলেছে, সেটা যদি আরেকটু আগেও থামানো যেত, হয়ত ছবিটা অনেকটা ভাল হত।'
নীতি প্রণয়ণের পরেও কি সেটা কার্যকর হয়? এদিকটাও ভাবার মত। ভারতের প্রাণভোমরা পুণ্যতোয়া গঙ্গা। সারা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন, ঘনবসতিপূর্ণ সুবিশাল এক সভ্যতার কার্যত অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এই একটি নদী। বিশ্ব-ইতিহাসে নীল, আমাজন, দানিউব, সিন্ধুর মতই মানব-সভ্যতার স্পন্দন ভারতীয় উপমহাদেশের গঙ্গা। কিন্তু নানা কারণে গঙ্গায় লাগামছাড়া দূষণ দেখে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঘোষণা করেছিলেন 'গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান'। প্রায় সাড়ে আটশো কোটি টাকা খরচ করে নেওয়া হয়েছিল একাধিক পদক্ষেপ, যাতে অন্তত ২৫ টি শহরে গঙ্গা দূষণকে বাগে আনা যায়। সাড়া ফেলেছিল খুব, পরে তাতে সামিল হয় বিশ্বব্যাঙ্কের মত একাধিক সংস্থা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয়নি কোনও। নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেও বিস্তর ঘটা করে শুরু করেছিলেন 'নমামী গঙ্গে' প্রকল্প। কিন্তু গঙ্গাদূষণ বেড়েই চলেছে। কলকাতার ক্ষেত্রে এটা কতটা খারাপ খবর?
আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করা বাঙালি বৈজ্ঞানিকের গলাতেও যেন চিন্তার সুর ধরা পড়ল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় তাঁর বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গ অববাহিকার জলে আর্সেনিক দূষণের রাসায়নিক চরিত্র। পরিদর্শক ছিলেন অ্যালান ফ্রায়ার। অভিজিৎবাবু বললেন, 'খুবই চিন্তার কথা! যেটা খুব বেশি হয়, হয়ত সবাই জানে না, এই যে নদীর জল আর ভূগর্ভস্থ জল, এগুলো আসলে পরস্পর সংযুক্ত। ভূগর্ভস্থ জল যখন কোনও উপত্যকায় এসে মুক্ত হয়, সেটাই নদী হয়ে বয়ে চলে। ফলে গঙ্গার জলে যদি দূষণ হয়, এটা কিন্তু পাশের ভূগর্ভস্থ জলটাকেও দূষিত করছে।'

কলকাতায় জলবাহিত রোগের প্রকোপ আজকের নয়। বস্তুত, কলেরা, আন্ত্রিকের মত একাধিক রোগের এককালে পীঠস্থান ছিল বাংলা। বিভিন্ন জলবাহিত রোগ থেকে হওয়া মারাত্মক সংক্রামক রোগের চিকিৎসার সূত্রেই এই কলকাতার চিকিৎসক ডাক্তার দিলীপ মহলানবিশ আবিষ্কার করেন 'ওরাল রিহাইড্র্যান্ট সলিউশন' বা ওআরএস। কিন্তু অভিজিৎবাবুর পরের কথাটা আরও মারাত্মক। 'এই যে ভূগর্ভস্থ জল কমে আসছে, তার সরাসরি ফলশ্রুতি হচ্ছে, গঙ্গা ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাদের হিসেবে, গত পঞ্চাশ বছরে ৫৯ শতাংশ গঙ্গার ভূগর্ভস্থ জলের যোগান শুকিয়ে গিয়েছে। এইরকম চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ কমে যাবে! শুধু গঙ্গাই নয়, ভারতের নানা বড় নদীই এইভাবে শুকিয়ে আসছে।'
আজকের ভারতে জল নিয়ে সরকারি নীতি প্রণয়নে যথেষ্ট খামতি রয়েছে। একাধিক মন্ত্রকের হাতে জলের দায়িত্ব রয়েছে। যার ফলে কাজের সমন্বয়ে সমস্যা আছে। অভিজিৎবাবুর মতে, এখন অর্থনীতির দিক থেকে সরকার বেশি চিন্তা করছে, ভৌতবিজ্ঞানের চরিত্র নিয়ে অতটা মাথা ঘামাচ্ছে না তারা।
দ্য ওয়ালের তরফে তাঁকে প্রশ্ন করা রয়েছিল জলাভূমি নিয়ে। বিশেষ করে কলকাতায় রয়েছে জলাভূমির এক বিস্ময়, কলকাতার 'প্রাকৃতিক জলশোধক', কার্যত কলকাতার কিডনি—পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। রয়েছে একাধিক হ্রদ, সাঁতরাগাছি ঝিলের মত বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভার। কিন্তু ক্রমাগত জলাভূমি ভরাটের ফলে বিপদের মুখে সেগুলো। কার্যত নজিরবিহীন সংকটে 'রামসর সাইট' হিসেবে স্বীকৃত পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। কতটা বিপদ ডেকে আনছে এটা?

'আসলে আমরা যেটা করছি, ওই অল্পসময়ের লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি লাভের জায়গাগুলো আমরা ধ্বংস করে ফেলছি', বললেন অভিজিৎবাবু। 'যদি আপনি ইতিহাস দেখেন, এককালে কলকাতায় বহু জলাভূমি ছিল। যেগুলো পড়ে রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমিটাই সেই অর্থে বেঁচে আছে। আদিগঙ্গার অবস্থা দেখুন। মেট্রোর থাম বসে আদিগঙ্গার প্রবাহটাই আটকে গিয়েছে। অথচ আদিগঙ্গাই ছিল এককালে গঙ্গার মূল প্রবাহ। দক্ষিণ কলকাতার জল-ভারসাম্যটা আদিগঙ্গাই নিয়ন্ত্রণ করত। এখন দেখুন, এই যে দক্ষিণ কলকাতায় এত জল জমছে, তার অন্যতম কারণ আদিগঙ্গার এই বেহাল দশা। এদিকে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি হচ্ছে যাকে বলে 'ডিসচার্জ জোন'। এটা যদি বুজিয়ে ফেলা হয়, তাহলে জল তো উপচাবেই। সাধারণ ভৌতবিজ্ঞানের যুক্তি। ফলে জলাভূমির জন্য একটা মিলিত, ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা দরকার। না হলে আরও বিপদ এলে আর কিছু করার থাকবে না।'
দু’লক্ষ কোটি টাকার ব্যাঙ্কের কর্ণধার, কিন্তু আজও তিনি একশো দশ ভাগ খাঁটি বাঙালি