দ্য ওয়াল ব্যুরো, মালদহ: বিকেলবেলা খেলার শেষে বাড়ি এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে চার শিশু। ডাক্তারের কাছে না নিয়ে ভূতে ধরেছে ভেবে ডাকা হয় গুণিন। শুরু হয় ঝাড়ফুঁক। আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে থাকে তারা। বাধ্য হয়ে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে দু'জনের। আশঙ্কাজনক দু'জনের চিকিৎসা চলছে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এই ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে গাজোল থানার কদমতলি এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত দুই শিশুর নাম সফিকুল আলম (৫) ও ফিরোজ রহমান (৭)। মেডিক্যাল কলেজে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি রয়েছে কোহিনুর খাতুন (৬) ও শাবনুর খাতুন (৩)। এরা দুই বোন । প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে শুক্রবার বিকেলে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি জঙ্গলের মধ্যেই ওই চার শিশু খেলা করছিল। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তারা। মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরোতে থাকে। এতেই পরিবারের লোকেদের ধারণা হয় যে ওই শিশুদের ভুতে ধরেছে। এরপরই গুনিন-ওঝাদের এনে ঝাড়ফুঁক শুরু করে পরিবারের লোকজন। দীর্ঘক্ষণ শিশুদের নিয়ে চলে ঝাড়ফুঁক। কোনও ফল না হওয়ায় অবশেষে তাদের নিয়ে আসা হয় মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পথেই মৃত্যু হয় সফিকুল আলম নামে এক শিশুর। পরে হাসপাতালে মারা যায় ফিরোজ রহমান নামে আরও এক শিশু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত সফিকুল আলমের বাবা রফিক আলি পেশায় দিনমজুর। মা নাসিমা বিবি গৃহবধূ। মৃত ফিরোজ রহমানের বাবা খাবির হোসেনও পেশায় দিনমজুর। অসুস্থ কোহিনুর এবং সাবনুরের বাবাও দিনমজুর।অসুস্থ কোহিনুরের মামা আসিফ শেখ বলেন, “গ্রামে ভূতের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। শিশুদের ওপর ভর করছে ভূত। দুটো বাচ্চা মারাও গেছে। আমার ভাগ্নিরাও ভূতের খপ্পরে পড়েছিল। এখন চিকিৎসা চলছে। এর আগেও গ্রামের বেশকিছু মানুষকে ভুতে ধরেছিল। কয়েকজন মারাও গিয়েছে। আমরা আতঙ্কে আছি। কদমতলি গ্রামে ভূত তাড়ানোর কী উপায় আছে সেজন্যই ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
এমন ঘটনা শুনে হতবাক গাজোলের তৃণমূল বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস। শিশুমৃত্যুর খবর জেনেই শনিবার সকালেই মালদহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন তিনি। কথা বলেন মৃত শিশুদের পরিবারের লোকেদের সঙ্গে। এরকম কুসংস্কার যাতে গ্রামবাসীদের মধ্যে না ছড়ায় তা নিশ্চিত করতে শনিবার ওই গ্রামেও যান বিধায়ক। কী কারণে ওই শিশুদের মৃত্যু হল পুলিশ ও প্রশাসনকে তা খতিয়ে দেখার আর্জি জানান তিনি। তাঁর কথায় “ওই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে যে এমন কুসংস্কার রয়েছে তা জানা ছিল না। রহস্যজনকভাবে দুই শিশু মারা গিয়েছে। অসুস্থ দু’টি শিশুকে মেডিক্যাল কলেজে দেখতে গিয়েছি। কদমতলি গ্রামে গিয়ে ওখানকার মানুষদের বুঝিয়েছি ভূত বলে কিছু হয় না। সবই কুসংস্কার। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে হয়তো শিশুরা প্রাণে বেঁচে যেত। প্রশাসনকে বলেছি সঠিকভাবে তদন্ত করে বিষয়টি উন্মোচন করুক। নইলে গ্রামবাসীদের একাংশের মধ্যে এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে যাবে।”
মেডিকেল কলেজ কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ও পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর জানিয়েছে, জঙ্গলে খেলার সময় হয়তো বিষাক্ত কোনও ফল শিশুরা খেয়ে ফেলেছিল। যার কারণেই শরীরে দ্রুত বিষক্রিয়ার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। আর তা থেকেই এই ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু গ্রামবাসীদের একাংশ ভুতের কথা বলেই আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
মৃত্যুর কারণ জানতে দুই শিশুর ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে গাজোল থানার পুলিশ।