
শেষ আপডেট: 24 April 2023 05:34
তাঁকে ফোন করলে মন ভরে যেত। মন্ত্রী থাকাকালীন খবরের প্রয়োজনে কখনও সখনও পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ফোন করলেই ভেসে আসত কলারটিউন—‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক হে ভগবান।’
পার্থবাবু প্রকৃতিপ্রেমী (Nature) ছিলেন। বারুইপুরের বাগানবাড়ি, জাঙ্গিপাড়ায় অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের মামারবাড়িতে গিয়ে পুকুরপাড়ে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে পছন্দ করতেন। এসবই জানা গিয়েছিল পার্থবাবু জেলে যাওয়ার পর। তখন বোঝা গিয়েছিল কলারটিউনটা নিছক লোক শোনানোর জন্য ছিল না। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকেই তিনি নদীমাতৃক ও কৃষিভিত্তিক বাংলাকে (West Bengal) পছন্দ করতেন।
বাইরের জল, হাওয়া থেকে পার্থবাবু এখন দূরে। জেলের অন্ধ কুঠুরিতে দিন কাটছে তাঁর। পার্থবাবুকে ব্যক্তি হিসাবে না দেখে যদি রাজনীতিক বা রাজনীতির (Bengal Politics) সঙ্গে প্রকৃতি সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।
তাতে ধানখেত, পাহাড়ি রাস্তা, কচুবন, দিগন্তবিস্তৃত খোলা মাঠ, পুকুরপাড়—বারবার হয়ে উঠেছে রাজনীতির চর্চার বিষয়। সেসব ঘিরে তৈরি হয়েছে ভয়, উৎকণ্ঠা, রোমাঞ্চ, এমনকী হাসির রসদও।
তখন বাম জমানা। ২০০৯ সাল। বর্ধমান তখনও একটা জেলা। যে জেলার পুবে কৃষি আর পশ্চিমে শিল্প। সেই পুব দিকের মঙ্গলকোটের সিপিএম নেতা ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায় খুন হয়েছিলেন। ফাল্গুনি ছিলেন বর্ধমান জেলা পরিষদের সদস্য। মঙ্গলকোটে তখন কংগ্রেসের বেশ দাপট। ফাল্গুনি খুন হওয়ার পর সিপিএমের রোষ আছড়ে পড়েছিল কংগ্রেসিদের উপর। সেই সময়ে মঙ্গলকোটের বহু কংগ্রেসকর্মী ঘরছাড়া হয়েছিলেন। তাঁদের ত্রাণ দিতে গিয়ে তৎকালীন কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইয়াকে যে পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল তা মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
সিপিএমের তাড়া খেয়ে মানস ধুতি গুটিয়ে ছুটেছিলেন ধানখেতের আলপথ ধরে। টেলিভিশনে সেই দৌড় দেখেছিল বাংলা। শস্যগোলা বর্ধমানের সোনালি ধানের খেত ধরে মানসের দৌড় প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল রাজনীতির রোমাঞ্চকে। কৃষিজমিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বাংলা বারবার দেখেছে। কখনও অপারেশন বর্গা, কখনও সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম। কিন্তু কৃষি জমির উপর দিয়ে রাজনীতিকের দৌড় সেই বোধহয় ছিল প্রথম।
তারপর আবার বেশ কিছুদিনের বিচ্ছিন্নতা। এল ২০১৭ সাল। দিলীপ ঘোষ তখন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। দার্জিলিংয়ের একটি কর্মসূচিতে দিলীপকে কী হ্যাপাই না পোহাতে হয়েছিল। পাহাড়ি খাড়া রাস্তা ধরে ছুটতে হয়েছিল তাঁকে। এমনিতে দিলীপ রোজ শারীরিক কসরত করেন। ফলে মানস ভুঁইয়ার চেয়ে তাঁর ফিটনেস বেশি বলেই মনে করেন অনেকে। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা সাক্ষী আছে দিলীপের সেই দৌড়ের।
এর ঠিক দু’বছর পর আবার রাজনীতির চর্চায় এসেছিল প্রকৃতি এবং সবুজ। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস। করিমপুর বিধানসভায় উপনির্বাচন হচ্ছিল। বিজেপির প্রার্থী ছিলেন আজকের তৃণমূল মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার। একটি বুথে ভোট দেখতে গিয়ে তাঁকে মহা ফাঁপড়ে পড়তে হয়েছিল। স্থানীয় তৃণমূলের লোকজন বিজেপি প্রার্থী জয়প্রকাশকে লাথি মেরে কচুবনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। মঙ্গলকোটের ধানখেতের পর আবার রাজনীতিতে জুড়ে গেল কচুবনের কথা। জয়বাবু এখন যখন তৃণমূলে তখন প্রায়ই তাঁকে বিজেপি নেতারা খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘কচুবনটা কেমন ছিল?’ সিপিএমও সে সময়ে একটা ছড়া বেঁধেছিল, ‘তৃণমূলের একি ত্রাস, কচুবনে জয়প্রকাশ!’
তারপর ঠিক দু’বছরের মধ্যে আবার একটি রোমহর্ষক দৌড় দেখা গিয়েছিল। একুশের যে দফায় আরামবাগে ভোট হচ্ছিল সেদিন দেখা গিয়েছিল তৃণমূল প্রার্থী সুজাতা মণ্ডলকে (তখনও নামের পরে খাঁ যোগ করতেন) সে কী তাড়া। বাঁশ হাতে করে কিছু লোক সুজাতাকে তাড়া করেছিল আরামবাগের আরান্ডি অঞ্চলে। তারপর সবুজ মাঠের উপর দিয়ে ছুটেছিলেন সুজাতা। ঘেমেনেয়ে একাকার কাণ্ড। কোনওরকমে একটা গ্রামে ঢুকে পড়েছিলেন। তারপর সেখানকার মহিলারা শীতলপাটির হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করেছিলেন সুজাতাকে। সুজাতার সেই দৌড় অনেককে মানসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
ধানখেত, কচুবন, খোলামাঠ পেরিয়ে বাংলার রাজনীতির আলোচনায় এখন শুধুই পুকুর আর পুকুর। বড়ঞা তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার বাড়িতে সিবিআই যাওয়ার পর তাঁর মোবাইল পুকুরে ছুড়ে ফেলার ঘটনাকে বোধহয় ভোলা যাবে না। সেই মোবাইল উদ্ধার করতে ৭০ ঘণ্টা ধরে জল ছেঁচা, এজেন্সির অভিযান—যে কোনও থ্রিলার সিনেমাকে হারিয়ে দিতে পারে। সেই জীবনের পুকুরের পরেই আবার আলোচনায় চলে আসে তেহট্টের তৃণমূল বিধায়ক তাপস সাহার বাড়ি সংলগ্ন পুকুরপাড়।
শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত তাপসকে সাড়ে চোদ্দ ঘণ্টা সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু তারমধ্যেই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। দেখা যায় বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে বসে আছেন তাপস। পরনে নীল-সাদা চেক লুঙ্গি, গায়ে নস্যি রঙের কলারওয়ালা টি-শার্ট আর গলা একটা গামছা। স্থানীয়রা দাবি করেন, সিবিআই ঢোকার ঘণ্টা দেড়েক আগেই তাপস ছিলেন সেই পুকুরপাড়ে। তার উপর ডাঙায় উদ্ধার হওয়া নথি পোড়ানো ছাই আরও কৌতূহলের উদ্রেক করেছিল। সিবিআই সেই পুকুরপাড়েও তল্লাশি চালিয়েছে। যদিও তাপসকে জিজ্ঞাসাবাদের পর চলে গিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি।
গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সম্প্রতি জার্মানি অবশিষ্ট দু’টি পারমাণবিক চুল্লিও বন্ধ করে দিয়েছে। সুইডিশ তরুণী গ্রেটা থুনবার্গের জলবায়ু আন্দোলন নাড়িয়ে দিয়েছে ইউরোপকে। সারা দুনিয়া পরিবেশ চর্চায় মনোনিবেশ করছে। বিকল্পের সন্ধানে ছুটছে। তখন বাংলায় বহু জায়গায় জলাভূমি ভরাট, গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ থাকলেও প্রকৃতির সঙ্গে বারবার মিশে যাচ্ছে রাজনীতি। ধানখেত, পাহাড়ি রাস্তা, কচুবন, দিগন্তবিস্তৃত খোলা মাঠ, পুকুরপাড় ফিরে ফিরে আসছে। প্রকৃতির শোভা মাখা এই বাংলাতেই কি জীবনানন্দ দাস ফিরে আসতে চেয়েছিলেন শঙ্খচিল কিংবা শালিকের বেশে? কে জানে!
DA আন্দোলন কতদিন চলবে? হাইকোর্টের অসন্তোষ, সুপ্রিম কোর্টে শুনানি লাগাতার পিছোচ্ছে