৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী কোচবিহারের বড়দেবী (CoochBehar Barodevi) পূর্ণসাজে সেজে উঠছেন। থাকবে গহনার সাজ, কোষার জলে দেবীদর্শন ও অনন্য আচার।

কোচবিহারের বড় দেবী।
শেষ আপডেট: 24 September 2025 12:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোচবিহারের রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বড়দেবী পুজোতে এক বিশেষ দিন। পূর্ণসাজে সেজে উঠলেন দেবী। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার সময় দেবীবাড়ির বড়দেবী মন্দিরে মহার্ঘ্য ‘কোষার জল’ দিয়ে দেবীদর্শন করবেন জেলার জেলাশাসক অরবিন্দকুমার মিনা।
এর আগে প্রায় ৬০ ভরি সোনার গয়নায় দেবীকে সাজানো হয়। এই সমস্ত গহনা সারা বছর রাখা হয় মদনমোহন মন্দিরের স্ট্রং রুমে। আজ ভোরেই সেগুলি পুলিশি প্রহরায় মন্দির থেকে বের করে আনা হয় বড়দেবীর কাছে। নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, পুলিশ মোতায়েন থাকছে দেবীবাড়ি জুড়ে, নজরদারির জন্য বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরাও।
সোমবার পর্যন্ত চলেছে প্রতিমা সাজসজ্জার কাজ। শিল্পী প্রভাত চিত্রকর ও তাঁর দল দেবীর রঙচঙে সাজ সম্পূর্ণ করেন। এখানে দেবী দুর্গা রক্তবর্ণা, এবং দশভুজা রূপে অসুরবধ করছেন। তবে প্রচলিত দুর্গার মতো দেবীর পাশে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী বা সরস্বতী নেই, আছেন জয়া ও বিজয়া। সিংহ ও বাঘও প্রতিমার অংশ। এ এক অনন্য রূপ, যা ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের অংশ। শুধু কোচবিহার নয়, উত্তরবঙ্গ এবং নিম্ন অসম জুড়ে অসংখ্য ভক্তদের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু এই পূজা।
রাজপুরোহিত ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, সোমবার প্রতিপদে রঙসাজ ও বস্ত্রধারণ সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার দ্বিতীয়ার সকালে দেবীর পূর্ণসাজ হবে, তার পরেই দেবীদর্শনের শুভক্ষণ। মদনমোহন মন্দিরের কর্মী জয়ন্ত চক্রবর্তীও জানান, সকালেই গহনা পৌঁছবে দেবীবাড়িতে, এবং সাজানোর পর দেবী দর্শন উন্মুক্ত হবে।
বড়দেবীর গয়নার মধ্যে রয়েছে—সোনা ও রুপার ওরচাঁদ, ১০৯টি কাঠি ও লকেটসহ সোনার কাঠি মালা, ৭৮টি কলি দিয়ে তৈরি সোনার চাপকলি হার, আর বিশেষ নথ। এগুলো রাজ আমল থেকে সংরক্ষিত ধনসম্পদ, যা আজও মায়ের অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বড়দেবীর পুজো নিয়মকানুনেও প্রচলিত দুর্গাপুজোর তুলনায় বিস্তর পার্থক্য আছে। এখানে মোষ, পাঁঠা, পায়রা বলির প্রথা রয়েছে। প্রাচীন কালে নরবলির কথাও শোনা যায়, যদিও তা বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আজও অষ্টমীর রাতে বিশেষ গুপ্তপুজোয় নির্দিষ্ট একটি পরিবার থেকে একজন রক্ত প্রদান করে থাকেন দেবীর উদ্দেশ্যে। সেই আচার কেবল রক্তদাতা ছাড়া কারও প্রবেশাধিকার নেই।
এছাড়া এই পুজো চলে দীর্ঘ দুই মাস ধরে। মদনমোহন মন্দির থেকে আনা হয় ‘ময়না কাঠ’, তার পুজো শেষে কাঠ দিয়ে তৈরি হয় বিশাল প্রতিমার কাঠামো। ঐতিহ্য অনুসারে চার দফায় সম্পন্ন হয় ‘গৃহারম্ভ পুজো’। স্থায়ী মন্দির গড়ে ওঠার আগে প্রতিবছরই বড়দেবীর জন্য নতুন গৃহ নির্মাণ করে সেইখানেই পুজো হত। সেই প্রথা আজও অটুট।
বড়দেবীর পূজা একদিকে রাজবাড়ির ঐতিহ্য, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের মানুষের অদ্ভুত ভক্তি ও আবেগের প্রতীক। অনন্য রীতিনীতি আর অদ্বিতীয় রূপে এই পূজা আজও বহন করছে কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য।