
শেষ আপডেট: 3 July 2023 04:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবার এনসিপিতে ভাঙন কি জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী জোট দানা বাঁধার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? ধাক্কা খাবে বিরোধীদেক ঐক্য তুলে ধরার প্রক্রিয়া?
মহারাষ্ট্রের রাজনীতির অঘোষিত বাদশা শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত যেভাবে এনসিপিতে ভাঙন ধরিয়ে শিবসেনা-বিজেপি জোটে শামিল হয়ে উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তাতে গোটা দেশে বিরোধী দলগুলির বোঝাপড়া ধাক্কা খেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট দল এবং রাজনৈতিক মহলের বড় অংশ মনে করছে।
বিরোধী দলগুলির পরস্পর বিরোধী অবস্থান সত্ত্বেও তারা কীভাবে একে অপরের হাত ধরবে, বিজেপির লাগাতার তুলে যাওয়া এমন প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির যে রাজ্যগুলির জোটকে দৃষ্টান্ত করে আসছিল তারমধ্যে মহারাষ্ট্র অন্যতম। গত বছর সেখানে শিবসেনার বিদ্রোহে সরকার হাতছাড়া হলেও বিরোধী জোট মহারাষ্ট্র বিকাশ আগারি অক্ষত। কোনও শরিক জোট ছেড়ে যায়নি। এমনকী সরকার হাতছাড়া হওয়ায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরেকে কাঠগড়ায় তোলেনি শরিকেরা।
রবিবারের ঘটনায় সেই জোট জোর ধাক্কা খেল। কিন্তু কংগ্রেসের অন্দরে এবং রাজনৈতিক মহলের বড় অংশে এই প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে, মহারাষ্ট্র-কাণ্ড কি স্রেফ অজিত পাওয়ারের বিদ্রোহ, নাকি এর পিছনে শরদ পাওয়ারেরও অঙ্ক আছে। বেঙ্গালুরুতে আর দিন-দশ-বারো পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পরবর্তী বিরোধী সমাবেশের আগে মহারাষ্ট্রে এনসিপি-র বিদ্রোহ বিজেপির হাত শক্ত করল বলেই অনেকে মনে করছেন।
কংগ্রেসের কেউই রবিবার রাত পর্যন্ত মহারাষ্ট্র নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্য করেননি। কিন্তু নেতারা অনেকেই মনে করছেন, রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে হাত-শিবিরের ক্রমশ বিরোধী মঞ্চে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার মুখে শরদের ইঙ্গিতেই ভাইপো অজিত এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, অজিত এবং ছগন ভুজবলদের মতো কয়েকজন বিধায়ক রবিবার মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পরও শরদ তাঁদের বহিষ্কার করেননি। এমনতী দলের কার্যকরী সভাপতি তথা শরদের স্নেহধন্য প্রফুল প্যাটেল রাজভবন পর্বটুকু বাদে আগাগোড়া অজিতের পাশে ছিলেন।
পাওয়ার ইদানীং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ভূমিকা নিয়েছেন। কংগ্রেসের নেতৃত্ব মেনে নিতে যে নেতারা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন তাঁদের অন্যতম মহারাষ্ট্রের এই প্রবীণ নেতা। কিন্তু শরদের অতীতের কারণে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব সর্বদা এনসিপি সুপ্রিমোকে খানিক সন্দেহের চোখে দেখে। যদিও রাহুল গান্ধী-সহ বাকিরা প্রকাশ্যে শরদকে যথেষ্ট সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু মনে মনে সংশয় বয়ে বেড়ান, অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো নরেন্দ্র মোদীরও পাশে দাঁড়িয়ে যাবেন না তো মহারাষ্ট্রে রাজনীতির এই চাণক্য? এমনীতেই মোদীর সঙ্গে এই মারাঠা নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভাল।
কংগ্রেসের সন্দেহের কারণ, অতীতে বহু ঘটনার মতো সাম্প্রতিককালে বিরোধীদের সবচেয়ে জোরালো ইস্যু আদানি কাণ্ড নিয়ে পাওয়ারের উল্টো সুর। আচমকা তাঁর নিজের দলেও সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আদানি ইস্যুতে সংসদের যৌথ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবির বিরোধিতা করে গোটা বিরোধী শিবিরকে অস্বতিতে ফেলে দিয়েছিলেন পাওয়ার। তিনি খোলাখুলি আদানি ও নরেন্দ্র মোদীর পাশে দাঁড়িয়ে যান। কেন্দ্রের সুরে আদানি কাণ্ড নিয়ে সংসদের যৌথ তদন্ত কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেন।
আড়াই দশক আগে এইভাবেই গোটা রাজনৈতিক মহলকেই চমকে দিয়েছিলেন পাওয়ার। পাশে দাঁড়িয়ে যান বিজেপি নেতা বাজপেয়ীর। ১৯৯৯-এ অটল বিহারী বাজপেয়ীর ১৩ মাসের সরকারের পতন হলে সনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনের সঙ্গে দেখা করে। বিজেপি রটিয়ে দেয়, সনিয়া প্রধানমন্ত্রী হতে চাইছেন। বাজপেয়ী, আদবানীরা প্রকাশ্যে দাবি তোলেন, একজন বিদেশিনী দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা তা নিয়ে দেশে বিতর্ক হওয়া দরকার।
ঘটনা হল, ক'দিন পরেই কংগ্রেস ওয়াকিং কমিটির সদস্য শরদ পাওয়ারও দলে দাবি তোলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন শুধু একজন ভারতীয়, এই মর্মে কংগ্রেস প্রস্তাব গ্রহণ করুক।
এরপর জেট গতিতে এগোয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। মারাঠা নেতার মতলব বুঝতে পেরে সনিয়াকে অসম্মান করার অভিযোগে পাওয়ারকে বহিষ্কার করে দল। জবাবে রাষ্ট্রবাদী কংগ্রেস বা এনসিপি গঠন করেন মহারাষ্ট্রের রাজনীতির এখনও শেষ কথা বলে পরিচিত এই নেতা।
কংগ্রেস নেতাদের অনেকেই একান্তে আশঙ্কা ব্যক্ত করে আসছিলেন, রাহুলের নেতত্বে কংগ্রেস এবং একাধিক বিরোধী দল যেভাবে ২০২৪-কে সামনে রেখে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে তাতে সময়-সুযোগ বুঝে মোদীর হাত শক্ত করতে পারেন পাওয়ার। মোদী একাধিকবার প্রকাশ্যে পাওয়ারের প্রশংসা করেছেন। খাস সংসদের ভাষণে একাধিকবার পাওয়ারের সুখ্যাতি করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, শরদ পাওয়ার হলেন সেই নেতা যিনি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্রেফ কংগ্রেসের পরিবারের (পড়ুন গান্ধী পরিবার) বাধায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। তাৎপর্যপূর্ণ হল গত মাসে পাটনায় বিরোধী দলগুলির বৈঠকের ঠিক আগের দিন এই বিষয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘাটেন পাওয়ার ঘনিষ্ঠ প্রফুলও। তিনিও খোলাখুলি বলেন, পাওয়ার যে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি তার আসল কারণ গান্ধী পরিবারের বিরোধিতা।
শুধু আদানি ইস্যুই নয়, ২০১৯ -এ রাফাল বিমান কেনার ইস্যুতেও সুর বদলে পাওয়ার সরকার তথা মোদীর পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। রাহুল গান্ধী ওই ইস্যুতেই ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলে প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করেন। পাওয়ারের বক্তব্য ছিল, ‘বিমান কেনায় অনর্থক প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এর সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ জড়িত।’
পাওয়ারের মোদীর পাশে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কার পিছনে শুধু তাঁর ইস্যুভিত্তিক সমর্থনই অন্য আরও অনেক কারণে এই নেতাকে কংগ্রেস সন্দের করে। এক. ১৯৯১, ১৯৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা, ১৯৯৯-এ কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের কারণে সনিয়া গান্ধীর উপর পাওয়ার এখনও ক্রোধ বয়ে বেড়ান। ফলে রাহুলের উত্থানও তিনি কৌশলে আটকানোর চেষ্টা করবেন।
দ্বিতীয়ত, পাওয়ারের রাজনীতির আসল শক্তি মহারাষ্ট্রের আখ ও আঙুর চাষিদের উপর প্রভাব এবং এই দুই ফলকে ঘিরে ধরে ওঠা চিনি ও আঙুরের সমবায় কারখানা। বিপুল টাকার ব্যবসায় উপর শরদের দখলদারিই রাজনীতিতেও তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ২০১৯-এ মোদী তাঁর বিস্তস্ত সৈনিক অমিত শাহকে সমবায় মন্ত্রী করার পর থেকেই পাওয়ার বিজেপি বিরোধিতার ধার কমিয়ে দিয়েছেন, বাড়িয়ে দিয়েছেন মোদী ভজনা। এছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সির দুর্নীতির তদন্ত তো আছেই। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন মামলায় আয়কর তদন্তে প্রায়ই এই প্রবীণ নেতাকে হাজিরা দিতে হয়।
পাওয়ার ‘পুশ’? মমতা-নীতীশদের বিরোধী বৈঠক ফের পিছোল, বেঙ্গালুরুতেই হবে কিনা অনিশ্চিত