দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান থেকে এক্কেবারে জেলা সভাপতির পদ। তাও আবার হুগলির মতো শিল্প-কৃষির মিশেলের বিরাট জেলায়। তপন দাশগুপ্তকে সভাপতি পদ থেকে সরানোর পর দিদি আস্থা রেখেছিলেন দিলীপ যাদবের উপরেই। কিন্তু একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে যখন একুশের বিধানসভার রণডঙ্কার বাজিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সেই দিলীপ যাদবকে নিয়ে তুমুল কোন্দল শুরু হয়েছে হুগলির তৃণমূলে। যা সামাল দিতে তড়িঘড়ি বৈঠকে বসতে হল যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরকে।
আরও পড়ুন
বৃহস্পতিবার শ্রীরামপুর রবীন্দ্র ভবনে সংগঠন নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলেন দিলীপ। ডাকা হয়েছিল দুই সাংসদ, সমস্ত বিধায়ক ও শাখা সংগঠনের জেলা নেতৃত্বকে। কিন্তু সেই বৈঠকে দু'চারজন বিধায়ক ছাড়া যাননি কেউ। এমনকি দুই সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অপরূপা পোদ্দারও ছিলেন না। যদিও অপরূপা ঘনিষ্ঠরা বলছেন, দিদির তো সদ্যোজাত শিশু রয়েছে, সেই কারণে বৈঠকে যাননি। তৃণমূল সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর রাতে দুই জরুরি বৈঠক ডাকেন অভিষেক।
যুব তৃণমূল সভাপতির বৈঠকে ডাকা হয় দুই বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল ও বেচারাম মান্নাকে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রশান্ত কিশোরও। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিষেকদের সামনে দিলীপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বেচা এবং প্রবীর। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, দিলীপ যে ভাবে দল পরিচালনা করছেন তাতে সিংহভাগ বিধায়ক ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের এক জেলার নেতার কথায়, গত কয়েক মাসে হুগলি জেলার তৃণমূল রূপান্তরিত হয়েছে কাঁঠাল বাগান বাজারের তৃণমূলে। তাঁদের অভিযোগ, দলকে উত্তরপাড়ার মধ্যে কুক্ষিগত করে রেখেছেন জেলা সভাপতি।
জানা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে জেলা সভাপতির হাত থেকে যাবতীয় ক্ষমতা সরিয়ে কো-অর্ডিনেটরদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের তিন কো-অর্ডিনেটর হলেন জাঙ্গিপাড়ার বিধায়ক স্নেহাশিস চক্রবর্তী, হরিপালের বিধায়ক বেচারাম মান্না ও আরামবাগের সাংসদ অপরূপা পোদ্দার। জেলার সব কমিটি ভেঙে নতুন করে গড়ার কথাও নাকি বলা হয়েছে।
সূত্রের মতে, এখন হুগলিতে সমীকরণ খানিকটা এইরকম--- দিলীপ যাদবের দিকে রয়েছেন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, সিঙ্গুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, গোঘাটের বিধায়ক মানস মজুমদার। বাকি সবাই তাঁর বিরুদ্ধে। সেই বিরুদ্ধ শিবিরে আবার রয়েছেন বাঘাবাঘা নেতানেত্রী। তপন দাশগুপ্ত, তপন মজুমদার, অসীমা পাত্ররা।
বলে রাখা ভাল, জেলার ১৮ টি বিধানসভার আসনের মধ্যে ষোলর ভোটে ১৬টি ছিল তৃণমূলের দখলে। একটি সিপিএম এবং একটি কংগ্রেসের। শক্তপোক্ত সেই জেলায় উনিশের লোকসভায় ধস নেমেছিল। হুগলি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। আরামবাগে অপরূপা জিতেছেন দু'হাজারেরও কম ভোটে। অনেকের মতে ওর থেকে পৌরসভার ওয়ার্ডে কাউন্সিলদের লিডের মার্জিন বেশি হয়। শ্রীরামপুর ছাড়া বাকি দুই আসনেই পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে।
এ হেন জেলায় দলের মধ্যেকার কোন্দল নিয়ে নাজেহাল তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। পরিস্থিতি এমনই যে, অভিষেক, পিকে-রা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্দেশ দিয়েছেন সব বিধায়ককে নিয়ে বৈঠক করতে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সেই বৈঠক হবে চুঁচুড়ায়। দিলীপ যাদবকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে সূত্রের খবর তিনিও ডাক পেয়েছেন ওই বৈঠকে।
জেলা নেতারা এখন তাকিয়ে আছেন কল্যাণের ভূমিকা কী হয় তার দিকে। জেলার রাজনীতিতে দিলীপের পরিচয় কল্যাণ ঘনিষ্ঠ বলেই। যদিও অনেকে এও বলছেন, কল্যাণ যখন দেখবেন অন্তত এক ডজন বিধায়ক দিলীপের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছেন তখন তাঁকেও ভাবতে হবে।
সব মিলিয়ে টানটান উত্তেজনায় বৈঠক হতে চলেছে বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা। তাতে একাংশ দাবি তুলতে পারে, দিলীপকে সরানো হোক। ক্ষোভ সামাল দেওয়ার পাল্টা কৌশলে কল্যাণরা হয়তো দিলীপ রেখে আরও কয়েকজনকে বিধানসভা ভিত্তিক দায়িত্ব দিয়ে দিতে পারেন। যাতে দু'কূলই রাখা যায়। তা হলেও দিলীপের ক্ষমতা খর্ব হবে। নামেই তিনি হয়তো জেলা সভাপতি থাকবেন। বাকিটা হবে অন্য ভাবে।