দশমীতে যুদ্ধ শুরু, দ্বাদশীতে রাবণ বধ, প্রথা মেনে রাবণ কেটেই অশুভের বিনাশ হয় বিষ্ণুপুরে
মৃন্ময় পান, বাঁকুড়া: দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জন। তার পরই অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির উত্থানে রাবণ দহন। উমার আগমনী থেকে বিসর্জন— চার দিনের জৌলুষ শেষেও উৎসবের রেশ রয়ে যায় এক সময়ের মল্ল রাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরে। তাই শারদোৎসব শেষ হয়েও হয় ন
শেষ আপডেট: 22 October 2018 18:30
মৃন্ময় পান, বাঁকুড়া: দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জন। তার পরই অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির উত্থানে রাবণ দহন। উমার আগমনী থেকে বিসর্জন— চার দিনের জৌলুষ শেষেও উৎসবের রেশ রয়ে যায় এক সময়ের মল্ল রাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরে। তাই শারদোৎসব শেষ হয়েও হয় না শেষ। ঐতিহ্য আর পরম্পরা মেনে রাবণ কাটা উৎসবে মেতে ওঠেন স্থানীয়রা।
রাবণ দহন স্থানীয়দের মুখে মুখে হয়ে গেছে ‘রাবণ কাটা’ উৎসব। প্রতি বছর দশমীতে এই উৎসবের শুরু। শেষ হয় দ্বাদশীতে রাবণ বধের পর, থুড়ি রাবণ কাটার পর। এই উৎসব মূলত রামভক্ত বৈষ্ণব অর্থাৎ রামায়েৎ বৈষ্ণবদের। বাঁকুড়ার অতি প্রাচীন শহর কাটানধার। সেখানেই রামায়েৎ বৈষ্ণবদের রঘুনাথজিউর মন্দির প্রাঙ্গন থেকে রাবণ কাটা উৎসবের শোভাযাত্রা বার হয়। এই শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ স্থানীয় লোক শিল্পীদের রাবণ কাটা নাচ।
বিষ্ণুপুর শহরের বাসিন্দা পুরাতাত্ত্বিক, গবেষক চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের কথায়, ‘‘রাবণ বংশের কুম্ভকর্ণ ও ইন্দ্রজিৎ বধ শেষে দ্বাদশীর রাতে রাবণ বধ হয়। রাবণকে কেটে খণ্ড বিখণ্ড করা হয় বলেই রাবণ কাটা নামে এই উৎসব পরিচিতি লাভ করেছে।’’
https://www.youtube.com/watch?v=4SdX2nx1EUM
শোভাযাত্রা দেখতে দূর দূর থেকে মানুষজন ভিড় জমান। আনন্দে মেতে ওঠে গোটা শহর। উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানে এখনও প্রাচীন প্রথা মেনেই হয়। সাবেকিয়ানার ছোঁয়া অনুষ্ঠানের পরতে পরতে। প্রাচীন রীতি মেনে দশমীতে রঘুনাথ জিউর মন্দিরে পুজোর পর কূম্ভকর্ণ বধ করা হয়। একাদশীর সন্ধেয় ইন্দ্রজিৎ বধ ও দ্বাদশীর রাতে মন্দির প্রাঙ্গনেই জনপ্রিয় রাবণ কাটা উৎসবের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হয়। এ বছরও রবিবার রাতে রঘুনাথ জিউর মন্দিরে ভিড় ছিল দেখার মতো। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের তরফ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল বেশ আঁটোসাঁটো।
ঐতিহাসিকদের মতে, বিষ্ণুপুরে রাবণ কাটা উৎসব মল্লরাজ রঘুনাথ সিংয়ের আমলে শুরু হয়। সেই থেকেই এখানে রঘুনাথ মন্দিরের স্থাপণ। ধারাবাহিকভাবে মন্দির প্রাঙ্গনেই এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
রাবণ কাটা উৎসবে স্থানীয়দের সাজসজ্জাও চোখে পড়ার মতো। কেউ সাজেন জাম্বুবান, কেউ হনুমান, কেউ আবার সুগ্রীব বা বিভীষণ। মানুষকে আনন্দ দিতে এই ভাবেই সাজেন দিন মজুর নারায়ণ বারিক, আইসক্রিম বিক্রেতা সুকুমার অধিকারী, রাজমিস্ত্রী মিঠুন লোহার, সব্জি বিক্রেতা রঞ্জিত গরাইরা। সঙ্গত দেন স্থানীয় ব্যান্ড পার্টির সদস্যরা। শনের তৈরি পোশাক পরে দ্বাদশীর সন্ধেয় নাচের তালে তালে শুরু হয় যুদ্ধ। শিল্পীদের উৎসাহকে ছাপিয়ে যায় দর্শকদের উন্মাদনা।
প্রায় দেড় দশক ধরে রাবণ কাটা উৎসবে রাবণের মাটির মূর্তি তৈরি করছেন নারায়ণ গোস্বামী। রাঁধুনির কাজ করেন নারায়ণ। এক হাতে রাঁধেন, অন্য হাতে মূর্তি গড়েন। সব কাজেই তিনি পটু।
দ্বাদশীর শেষে আবার শূন্যতা। ফের এক বছরের প্রতীক্ষা। স্থানীয়দের মতে, প্রাচীন এই প্রথা পালিত হয় খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে। এই কটা দিন সব দুঃখ ভুলে আনন্দে মেতে ওঠেন মানুষ। অভাব ভুলে সবার মুখেই খুশির আলো।