বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি থেকে থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে—নিতাই দত্তের (Nitai Dutta) জীবনের গল্প এখন তদন্তের স্ক্যানারে। ইডির অভিযানে ফের বিতর্ক তুঙ্গে। জানুন বিস্তারিত।

নিতাই দত্ত ও সুজিত বসু।
শেষ আপডেট: 10 October 2025 16:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সকালবেলায় খবরের কাগজ বিলিয়ে দিন শুরু করা সেই তরুণ আজ ইডির (ED) নজরে। মুর্শিদাবাদের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান নিতাই দত্ত (Nitai Dutta), যাঁর জীবনের গতিপথ যেন এক সিনেমার গল্প। একসময় লেকটাউনের দক্ষিণদাXড়িতে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন, আর আজ তাঁর নাম জড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের বহুচর্চিত পুর-নিয়োগ দুর্নীতিতে। শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) তাঁর বাড়ি ও গোডাউনে অভিযান চালায়।
সূত্রের খবর, ওই দিন একযোগে প্রায় দশটি জায়গায় তল্লাশি চালায় তদন্তকারীরা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর বাসভবনও। পুর-নিয়োগ দুর্নীতি মামলার সূত্র ধরেই শুরু হয় এই অভিযান। ইডির দাবি, নিতাই দত্তের আর্থিক লেনদেনের একাধিক নথি তাঁদের হাতে এসেছে, যা দুর্নীতির অর্থ লুকোনোর দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০০৮ সালের দিকে নিতাই দত্ত কলকাতায় আসেন। তখন সংসারের দায়ে লড়াই চলছে প্রতিদিন। সকালে পত্রিকা বিলানো, দুপুরে কলেজ স্ট্রিটে বই-খাতা বিক্রি, এমন জীবনেই দিন কাটছিল তাঁর। কিন্তু সেই সময়েই ধীরে ধীরে রাজনীতির ঘ্রাণ পান তিনি। স্থানীয় তৃণমূলের কাজে যুক্ত হতে শুরু করেন ফুল-টাইম কর্মী হিসেবে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
সেই সময় বিধায়ক ছিলেন সুজিত বসু। নিতাই হয়ে ওঠেন তাঁর নিত্যসঙ্গী, পরে ঘনিষ্ঠ সহকারী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীর ছায়াতেই বেড়ে উঠতে থাকেন তিনি। একসময়ের পেপারবয় এখন হয়ে গেলেন বিধায়কের ‘আপ্ত সহায়ক’। অভিযোগ, এই পর্বেই নানা দুর্নীতির ছায়া ঘনীভূত হয় নিতাই দত্তকে ঘিরে। একে একে গড়ে ওঠে তাঁর প্রভাব—বাড়ি, ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, এমনকি গুদামঘরও।
সুজিত বসুর ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ২০২১ সালের কলকাতা পুরভোটে দক্ষিণ দমদম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদ পান নিতাই দত্ত। রাজনৈতিক প্রভাব তখন তুঙ্গে। তদন্তকারীদের দাবি, সেখান থেকেই তাঁর দুর্নীতির সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়তে থাকে। শুধু নিজের নয়, পরিবারের লোকেরাও পেয়ে যান সরকারি চাকরি— এমনই অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার।
পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ১৪টি পুরসভার নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে দক্ষিণ দমদমও রয়েছে। গত বছর ইডি তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সাত পাতার নথি উদ্ধার করেছিল, যাতে বহু আর্থিক লেনদেনের তথ্য মিলেছিল বলে জানা যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, এখান থেকেই নিতাইয়ের ‘রাজত্বের’ বিস্তার শুরু।
তদন্তের পথে উঠে এসেছে মন্ত্রী সুজিত বসুর নামও। শুধু আপ্ত সহায়ক হিসেবে নয়, দক্ষিণ দমদম পুরসভার কার্যনির্বাহী কমিটিতেও তাঁদের ঘনিষ্ঠ কাজের সম্পর্ক ছিল। অভিযোগের তালিকায় দুজনেরই নাম আসায় তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কীভাবে এবং কোন সময় থেকে এই যোগসূত্র দুর্নীতির জাল বুনেছে।
ইডির মতে, যে সময়ের দুর্নীতির তথ্য হাতে এসেছে, তখনই ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছিলেন নিতাই দত্ত এবং চেয়ারম্যান ছিলেন সুজিত বসু। সেই সময়ই নথি, নিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেনের বহু প্রমাণ জোগাড় হয়েছে।
নিতাই দত্তের গল্প এক আশ্চর্য উত্থানের ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে থেকে পুরসভা–রাজনীতির ক্ষমতাবান মুখ। কিন্তু এই উত্থানের পেছনে যদি দুর্নীতির ছায়া থাকে, তবে তা শেষমেশ তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে, সময়ই বলবে।