
শেষ আপডেট: 23 August 2020 11:18
হটহাউস পিরিয়ড:-
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, অতীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এখনকার থেকে ছিল অনেকটাই বেশি। বায়ুমন্ডলের প্রায় সবটা জুড়ে ছিল গ্রিনহাউস গ্যাস। আর প্রতিদিনের তাপমাত্রা ছিল নিকষ কালো অন্ধকার রাতের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের দ্বারা কার্বন নিঃসরণের ফলে যত না ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যার ফলে আজকাল তাপপ্রবাহের প্রবণতা বেড়েছে। সেইসঙ্গে গুরুতর হয়েছে সমস্যা। আর সেই কারণেই ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত্যু উপত্যকায় এমন অবিশ্বাস্য তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ক্রমশ মানুষের সহ্যসীমার থেকে অনেকটা বেশি হবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা।
অতীতের ফুটন্ত পৃথিবী:-
অতীতে পৃথিবী এখনকার তুলনায় অন্তত কয়েকগুণ বেশি উষ্ণ ছিল। তবে এই হিসেব বুঝতে হলে জিওলজিক্যাল সময় অনুসারে টাইম মেশিনে পাড়ি দিয়ে পিছিয়ে যেতে হবে ৫ কোটি বছর আগে আদি ইয়োসিন যুগে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওক্লাইমেটোলজিস্ট জেসিকা টিয়েরনিও জানিয়েছেন সেই সময়ে সত্যিই পৃথিবীর উষ্ণতা এতটা বেশি ছিল।
বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ প্রায় ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আদি ইয়োসিন যুগে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের থেকেও সামান্য বেশি। ভূতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, সেই সময়ের পৃথিবী পৃষ্ঠের সঙ্গে বর্তমানের ফারাক বিস্তর। তখন মেরু অঞ্চল বরাফাবৃত ছিল না। ক্রান্তীয় সমুদ্রের উষ্ণতা ছিল ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আদি ইয়োসিন যুগেরও কয়েক লক্ষ বছর আগে পৃথিবী ছিল আরও উষ্ণ। সেই যুগকে বলা হতো প্যালিওইয়োসিন-ইয়োসিন থার্মাল ম্যাক্সিমাম। ভূবিজ্ঞানীদের কথায় যত পিছনের সময়ে যাওয়া যাবে ততই পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। যেমন ৯ কোটি ২০ লক্ষ বছর আগে ক্রিটেসিয়াস হট গ্রিনহাউস পর্যায়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ছিল।
ওয়াশিংটন ডিসি-স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের মতে আজ থেকে ২৫ কোটি বছর আগে পারমিয়ান এবং ট্রিয়াসিক যুগের মধ্যবর্তী পর্যায়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের থেকে সামান্য বেশি। জেসিকার কথায়, "তখনকার কোনও দৈনিক তাপমাত্রার তথ্য নেই। তবুও এটা বলা যায় যে সমুদ্র ছিল ফুটন্ত জলে পরিপূর্ণ। আর ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালির সাম্প্রতিক উষ্ণতাই সম্ভবত তখনকার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ছিল। আর গড় উষ্ণতা যদি এই পর্যায়ে থাকে তাহলে মরুভূমি এলাকার পরিস্থিতি ঠিক কতটা ভয়ানক ছিল সেটা বোধহয় আন্দাজ করাই যায়।"
ভবিষ্যতে কতটা বাড়তে পারে পৃথিবীর উষ্ণতা:-
আগামীদিনে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা লাগামছাড়া ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ঠিক কোন জায়গায় পৌঁছতে পারে তা ভেবেই শঙ্কিত হয়েছেন ভূবিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন লক্ষ-কোটি বছর আগে হোক কিংবা এখন, ভূপৃষ্ঠের পারদ চড়ার অন্যতম কারণ বায়ুমন্ডলে অত্যধিক হারে গ্রিনহাউস গ্যাস এবং কার্বনের উপস্থিতি। আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণ, সমুদ্রগর্ভ থেকে মিথেন নির্গমন, মানজাতির মাত্রাছাড়া কার্বন ব্যবহার, গ্রিনহাউস গ্যাসের উপস্থিতি-----এই সবের কারণেই ধীরে ধীরে কার্যত ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে পৃথিবী।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির আর্থ সায়েন্টিস্ট ক্রিস্টিন বার্গম্যানের কথায়, "প্রকৃতির উপর মানুষের প্রভাবের ফলেই ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা। বায়ুমন্ডলে ক্রমেই বাড়ছে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ। অতীতেও আচমকাই বাড়তে শুরু করেছিল পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা। এখনও তাই-ই হচ্ছে।"
লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এক্সট্রিম ওয়েদার রিসার্চার জানিয়েছেন, আগামীদিনে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ঠিক কোন জায়গায় পৌঁছবে তার সঠিক অনুমান এখনই সম্ভব নয়। তবে যে হারে বায়ুমন্ডলে কার্বন এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে তাতে এটা বলাই যায় যে এই দশকের শেষে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা আরও ১০ থেকে ১৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেড়ে গিয়েছে।
পৃথিবীর অবস্থাও কি তাহলে হবে শুক্রর মতো:-
পৃথিবীর পড়শি গ্রহ শুক্র কার্যত ফুটন্ত গ্রহ। এই গ্রহের বায়ুমন্ডলে ঠাসা রয়েছে সালফার। ঘন, বিষাক্ত এই গ্রহের উষ্ণতা প্রায় ৯০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ৪৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। ভূবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা দূর-ভবিষ্যতে হয়তো এমনই অবস্থা হবে পৃথিবীরও।
মূলত সূর্যের তেজ বৃদ্ধি পেলে পৃথিবী পৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়বে। তবে শুক্রর ফুটন্ত উষ্ণতার কারণ সম্ভবত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্ল্যানেটারি সায়েন্টিস্ট পল ব্যারেনের মতে, লক্ষ-কোটি বছর আগে হয়তো পৃথিবীর এই পড়শি গ্রহে বাসযোগ্য প্রাকৃতিক পরিস্থিতি ছিল। তবে অনুমান বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেই হয়তো শুক্রের আজ এই দশা।
ব্যারেন আরও বলেছেন, হয়তো সূর্যের তীব্র তাপ রশ্মি কিংবা আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণের ফলেই শুক্র গ্রহে বেড়েছে সালফার এবং কার্বনের পরিমাণ। পৃথিবীতেও যেভাবে কার্বন এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে তার জেরে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও এমন সাংঘাতিক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। তবে যদি পৃথিবী শুক্রের মতো দুর্ভাগ্য এড়াতে পারে তাহলেও বিপদ কম নয়। ক্রমশ উষ্ণতা বাড়তে থাকে সূর্য একদিন কার্যত ভস্ম করে গিলে খাবে পৃথিবীকে, এমনটাই আশঙ্কা ব্যারেনের।