চৈতালী চক্রবর্তী
৩২৮ দিন। অর্থাৎ প্রায় ১১ মাস। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে (ISS) কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরলেন নাসার জনপ্রিয় নভশ্চর অ্যাস্ট্রো-ক্রিস্টিনা ওরফে ক্রিস্টিনা কচ। কাজাকাস্তানের তখন স্থানীয় সময় বিকেল ৩টে ১২ মিনিট। রাশিয়ান স্পেস এজেন্সি রসকসমসের (ROSCOSMOS) সয়ুজ কম্যান্ডার আলেকজান্ডার ও ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) নভশ্চর লুকা পারমিতানোর সঙ্গে পৃথিবীর মাটিতে পা রাখলেন ক্রিস্টিনা। প্যারাশুট থেকে সযত্নে নাসার সোনার মেয়েকে নামিয়ে আনলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। স্কট কেলির পরেই মহাকাশে একটানা দীর্ঘ সময় কাটানোর রেকর্ড করে ফেললেন ক্রিস্টিনা কচ। নাসা টুইট করে জানিয়েছে, মার্কিন মহাকাশচারীদের মধ্যে এটাই দ্বিতীয় দীর্ঘতম মহাকাশ অভিযান।
মহাশূন্যে ক্রিস্টিনা কাটিয়ে ফেলেছেন ৩২৮টি পার্থিব দিন-রাত। ভেঙে ফেলেছেন বেপরোয়া, সাহসী মহাকাশচারী পেগি হুইটসনের রেকর্ড। ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত পেগি মহাকাশে কাটিয়েছিলেন ২৮৮ দিন। সবচেয়ে বেশি মহাশূন্যে কাটানোর রেকর্ড এখন রয়েছে স্কট কেলির। ৩৪০টি পার্থিব দিন-রাত একটানা মহাকাশে কাটিয়েছিলেন এই নভশ্চর।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পদার্থবিদ, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস্টিনা এখন নভশ্চর
মিশিগানে জন্ম ক্রিস্টিনার। বেড়ে ওঠা উত্তর ক্যারোলিনায়। নর্থ ক্যারোলিনা স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথেমেটিক্স থেকে স্নাতকের পরে নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যা ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন ক্রিস্টিনা। পদার্থবিদ্যায় একাধিক গবেষণা আছে তাঁর। কিন্তু পেশায় ছিলেন ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার।
অভিযানের নেশা ছিল শিরায়-উপশিরায়। ২০০১ সালে নাসার অ্যাকাডেমি প্রোগ্রাম থেকে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন ক্রিস্টিনা। ২০১৩ সালে নাসার স্পেস-মিশনে যোগ দেন। গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের হাই-এনার্জি অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ল্যাবোরেটরিতে গবেষণা করেছেন ক্রিস্টিনা। নেতৃত্ব দিয়েছেন একাধিক স্পেস-মিশনের। অজানার খোঁজে পাড়ি দেওয়াই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। মহাকাশের রহস্যের খোঁজ করতে করতেই নভশ্চর হওয়ার ইচ্ছাটা আরও গাঢ় হয়।
https://twitter.com/NASA/status/1225457131547131908
সুমেরু-কুমেরু চষে ফেলেছেন বেপরোয়া ক্রিস্টিনা
২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্টার্কটিক প্রোগ্রামের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ছিল ক্রিস্টিনা কচ। সাড়ে তিন বছর কাটিয়েছেন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দুর্গম এলাকায়। নাসার দক্ষিণ মেরুর স্পেস স্টেশনে হাড়হিম ঠাণ্ডায় দিনের পর দিন গবেষণা চালিয়েছেন ক্রিস্টিনা। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চষে ফেলেছেন দক্ষিণ মেরুর বিপদসঙ্কুল এলাকা। ক্রিস্টিনা জানিয়েছেন, দক্ষিণ মেরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাকেন্দ্র আমুন্ডসেন-স্কট স্টেশনে তিনি যখন কাজ করতেন, সেখানকার তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নীচে ১১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুর্গম পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা ও সাহস তখনই তৈরি হয়ে যায়।
আন্টার্কটিকায় হিমবাহ নিয়ে গবেষণা করেছেন দীর্ঘদিন। একটা সময় মেরু অঞ্চলে উদ্ধারকারী দলের সদস্যও ছিলেন ক্রিস্টিনা। ২০০৭ সালের পর থেকে জনস-হপকিনস ল্যাবোরেটরির অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ল্যাবোরেটরিতে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন তিনি। গত বছর ১৪ মার্চ পৃথিবীর মাটি ছাড়েন ক্রিস্টিনা। সয়ুজ এমএস-১২-এ চেপে পৃথিবীর সব টান কাটিয়ে পাড়ি দেন আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে। তিনি ছিলেন একাধারে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার, নভশ্চর, গবেষক। শূন্য অভিকর্ষজ বল বা জিরো-গ্র্যাভিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে এতদিন গবেষণা চালিয়েছেন ক্রিস্টিনা।
অ্যাস্ট্রো-ক্রিস্টিনার জার্নি
https://twitter.com/ISS_Research/status/1224331710193643522
মহাশূন্যের গা ছমছমে আঁধারে সাত ঘণ্টা স্পেস-ওয়াকের রেকর্ড
১১ মাসে অন্তত ছ’বার মহাশূন্যে হেঁটেছেন ক্রিস্টিনা কচ। গত বছর সবচেয়ে বেশি সময় মহাকাশের অতলান্ত অন্ধকারে স্পেস-ওয়াকের রেকর্ড গড়ের এই নভশ্চর। ‘All Women Spacewalk’-এর লাইভ স্ট্রিমিং সামনে এনে নাসা জানিয়েছিল ৭ ঘণ্টা ১৭ মিনিট মহাকাশে হেঁটে রেকর্ড করেছেন অ্যাস্ট্রো-ক্রিস্টিনা ও অ্যাস্ট্রো-জেসিকা। সাধারণত দেখা যায় স্পেস স্টেশনে কোনও যান্ত্রিক গলদ দেখা দিলে তার মেরামতি করতে বাইরে আসেন নভশ্চররা। এ বার সেই দায়িত্ব ছিল ক্রিস্টিনা ও জেসিকার উপর। কোনও রোবোটিক আর্ম নয়, প্রযুক্তির সাহায্যও নয়, পায়ে হেঁটেই স্পেস স্টেশনে নির্ধারিত ইউনিটে পৌঁছন দুই মহিলা। ভিতরে থেকে সেই সময় কম্যান্ড দিচ্ছিলেন চারজন পুরুষ নভশ্চর। ইউনিটে পৌঁছে ব্যাটারি লাগিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে নির্দিষ্ট সময়েই ফিরে আসেন ক্রিস্টিনা ও জেসিকা। ‘উইমেন’স হিস্ট্রি মান্থ’-এ ইতিহাস গড়ে নাসা।
নাসার রেকর্ড বলছে, এই ১১ মাসে অন্তত ৫,২৪৮ বার পৃথিবীকে পাক খেয়েছেন ক্রিস্টিনা। যা ২৯১ বার চাঁদে গিয়ে ফিরে আসার সময়ের সমান।
মহাকাশে এখনও অবধি মোট ৬৫ জন মহিলা গিয়েছেন। ২০১৮ সাল থেকে মাইক্রোগ্র্যাভিটি নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। বিশ্বের ১০৬টি দেশে প্রায় ৩৬০০ জন মহাকাশবিজ্ঞানী ও নভশ্চর অংশ নিয়েছেন স্পেস-মিশনে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা স্পেস স্টেশনে ছ’মাসের বেশি কোনও নভশ্চর থাকেন না। মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলেন দীর্ঘসময় স্পেস স্টেশনে কাটালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। মার্কিন নভশ্চর স্কট কেলি ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন। কাটিয়েছিলেন এক বছরের বেশি। আইএসএস থেকে পৃথিবীতে ফেরার পর স্কটকে নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন শুধু শারীরিক (ফিজ়িয়োলজিক্যাল) বদল নয়, জিনের বদলও ঘটেছে দীর্ঘ মহাকাশবাসে। তবে ক্রিস্টিনা বলেন, “প্রাণের ঝুঁকি থাকলেও ঐতিহাসিক স্পেসওয়াক যে কোনও নভশ্চরের জীবনেরই মূল লক্ষ্য। মহাকাশ-অভিযানের লিঙ্গভেদ নিয়ে আমরা চিন্তা করছি না। এই অভিজ্ঞতা অনুপ্ররেণা দেবে বাকিদের। আরও অনেক মহিলাই অজানাকে জানতে, অচেনা চিনতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।”