দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোমবার সকাল। আকাশ ছেয়ে আছে কালো ধোঁয়া! দেড় কিলোমিটার দূরে লালবাজারের সামনেও পোড়া গন্ধে ভারী বাতাস। নাকে রুমাল চেপে চলছেন পথচারীরা। দমকলের গাড়ির ঘন ঘন টিং টিং শব্দ,সব হারানো মানুষের হাহাকার মায় বাগরি মার্কেট যেন আস্ত একটা ধ্বংসস্তূপ।
তবু নবান্নের সূত্রই বলছে, এটা এক্কেবারে জেনে শুনে বিষ পানের মতোই ট্রাজেডি। আত্মহত্যা এবং তাতে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো ষোল আনা ফৌজদারি অপরাধ!
কেন?
নবান্নের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, কে না জানে বড়বাজারের একাধিক বাড়ি জতুগৃহ হয়ে রয়েছে। অতীতে ক্যানিং স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ড বা নন্দলাল মার্কেটে আগুন লাগার ঘটনার স্মৃতি এখনও তাজা। বাগরি মার্কেটেরও যেন এমন ভবিতব্য হতে পারে তা জানতেন আমলারা। এবং সেই কারণেই গত বছর বাগরি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন কলকাতা পুরসভার মেয়র ও দমকল মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের সতর্ক করে মেয়র বলেছিলেন, আপনারা বিপদ সীমায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বাড়িটা ভেঙে ফেলুন। নতুন বাড়ি বানান। ততদিন পুনর্বাসনের জন্য জায়গা দেবে পুরসভা।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা শোনেননি। পাছে ব্যবসায়ীরা রেগে যায়, সে জন্য জোরাজুরি করেনি সরকারও। এমনকী সূত্রের মতে, রবিবার ঘনিষ্ঠ মহলে মেয়র অসন্তোষের সঙ্গে জানিয়েছেন, আমাদের সরকার বড্ড নরম। কাউকে কিছু বলা যাবে না। এটা হওয়ারই ছিল।
যদিও এর মধ্যেই সামনে এসেছে অন্য একটি তথ্য। গত ৩১ জুলাই কলকাতা কর্পোরেশনের লাইসেন্স বিভাগের তরফে বাগরি মার্কেটের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছিল। মহানাগরিক শোভন চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি হাই পাওয়ার কমিটি এই লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করে।
অন্যদিকে দমকলের এক অফিসার বলেন, কপাল ভাল শনিবার মাঝ রাতে আগুন লেগেছে। নইলে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যে ভাবে আগুন লেগেছে, তাতে কাজের দিন হলে লাশের মিছিল লেগে যেতে পারত!
প্রসঙ্গত, বাগরি মার্কেটে আগুন লেগেছিল শনিবার রাত ২ টো নাগাদ। সোমবার সকালেও তা দাউদাউ জ্বলছে।
দমকলের কর্তাদের মতে, একে তো ওখানে বড় ল্যাডার লাগানো মুশকিল। উপরি কাছে পিঠে জলের কোনও সোর্স নেই। ষোল বছর আগে ক্যানিং স্ট্রিটের এক বহুতলে আগুন লাগার পর ঠিক এই সমস্যা হয়েছিল। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিরোধী নেত্রী।
কলকাতার এক বণিক সভার বড় কর্তার কথায়, বাগরি মার্কেট যেমন তেমন কোনও বাজার নয়। এ মার্কেট ঘিরে রয়েছে নস্টালজিয়া। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগণা সহ দক্ষিণ বাংলার কয়েক লক্ষ খুচরো ব্যবসায়ী এখান থেকে পাইকারি জিনিস কিনে নিয়ে যান। সমস্যা হল, এখানকার অনেক ব্যবসায়ী ছাড়তে শেখেননি। সাময়িক লাভের আশায় এতো বড় ক্ষতির গুণাগার দিতে হল। খুব কম করে কয়েকশ কোটি টাকার জিনিস পুরে ছাই হয়ে গিয়েছে বাগরি মার্কেটে। তাঁর কথায়, সমান দোষী সরকারও। রাজ্য সরকার কঠোর হলে ব্যবসায়ীরা আইন মানতে বাধ্য। কিন্তু সেটাই বা হচ্ছে কোথায়।
সন্দেহ নেই মাঝেরহাট কাণ্ড থেকে চোখ সরিয়ে এখন সংবাদমাধ্যমের নজরও গিয়ে পড়েছে বাগরি মার্কেটের দিকে। পুলিশ ময়নাতদন্ত করার আগেই তা শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে সোমবার তড়িঘড়ি মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠক ডেকেছেন শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। হয়তো দশ দফা বিধিও ঘোষণা করবেন পার্থবাবু।
কিন্তু শাসক দলেরই এক নেতার কথায়, ভুলে গেলে চলবে না, এমন আলোচনা, কমিটি, বৈঠক সাম্প্রতিক সবকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পরেই হয়েছিল। কিন্তু তাতে কী হলো!
বাগরি মার্কেটও তো পুড়ে গেল।