দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁরা গবেষক। কিন্তু গোয়েন্দার মতো নজর। ক্ষুরধার বুদ্ধি। ফেলুদা-ব্যোমকেশের মতোই রহস্যের অতলে ডুবে সত্যের অনুসন্ধান করাই লক্ষ্য। ভারতের এমনই দুই সত্যান্বেষী গবেষকদের তথ্য চমকে দিয়েছে বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলকে। ফের একবার ভাবতে বাধ্য করেছে, এ মারণ ভাইরাসের উৎস প্রকৃতি নয়। মানুষের দুর্বুদ্ধি তাকে মারণাস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে তিলে তিলে। সংহারের রূপ দেওয়া হয়েছে এই ভাইরাসকে। তাই সে এত প্রাণঘাতী।
করোনাভাইরাস তো প্রকৃতিতে আগেও ছিল। সেই ভাইরাস তো এত ঘাতক নয়। কিন্তু করোনাভাইরাস গোত্রেরই সার্স-কভ-২ কীভাবে মানুষের সমাজে অতি মহামারী তৈরি করল সেটাই চিন্তার বিষয়। এই ভাইরাসের সঙ্গে প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া করোনাভাইরাসের মিল আছে, বাদুড়ের শরীরে পাওয়া ব্যাট ভাইরাসেরও মিল আছে, কিন্তু তাও সে আলাদা। হাজার গুণে বেশি সংক্রামক। কীভাবে এমনটা হল সে নিয়েই বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে চিনের উহান প্রদেশের বায়োসেফটি ল্যাবরেটরিকে। কারণ এই ল্যাবরেটরিতেই সেই রহস্যের বীজ পোঁতা আছে বলেই দাবি বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীমহলের। মারণ ভাইরাস যে উহানের ল্যাব থেকেই ছড়িয়েছে , হয় অসতর্কভাবে বা পরিকল্পিতভাবে সে নিয়ে নানা তথ্য সামনে আসছে। কিন্তু অনেক আগেই এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিয়েছিলেন ভারতের দুই বিজ্ঞানী ডক্টর রাহুল বাহুলিকার ও তাঁর স্ত্রী মোনালি রাহালকার। বর্তমানে তাঁরা আরও কিছু প্রশ্ন তুলেছেন যা উহানের ল্যাব থেকে ভাইরাস লিক হয়ে যাওয়ার সন্দেহকেই আরও জোরদার করে।
উহানের ল্যাব-লিক থিওরি নিয়ে তোলপাড় বিশ্ব, চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন গবেষক দম্পতি
ডক্টর মোনালি পুণের আঘারকার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বায়োএনার্জি গ্রুপের বিজ্ঞানী। তাঁর স্বামী ডক্টর রাহুল বিএআইএফ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ। এই দম্পতি সার্স-কভ-২ ভাইরাস নিয়ে খুঁটিনাটি গবেষণা করছেন। ভাইরাসের উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে তাঁরা কিছু প্রশ্ন তুলেছেন যা উহানের ল্যাব থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্বকেই আরও জোরালো করেছে।
গবেষক দম্পতি বলেছেন, এই সংক্রামক ভাইরাসের উৎস প্রকৃতি নয়। কারণ করোনাভাইরাসের যে প্রজাতিরা আছে তাদের এমন মারণ ক্ষমতা নেই। মানুষের শরীরে ঢুকে কোষের প্রোটিন চিনে নেওয়া এত সহজ কাজ নয়। তার জন্য ভাইরাসকে কৃত্রিমভাবে প্রোগ্রাম করতে হয়। সার্স-কভ-২ ভাইরাস যেভাবে মানুষের শরীরে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে তার থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে এই ভাইরাসকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় মিউট্যান্ট করে তোলা হয়েছে। হিউম্যান ট্রান্সমিশন হতে পারে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে ভাইরাসকে।

গবেষকরা বলছেন, বাদুড় থেকে ভাইরাস ছড়ানোর তথ্য খুব একটা মানা যায় না। কারণ বাদুড়ের শরীরে পাওয়া ভাইরাস তথা ব্যাট ভাইরাস এসিই-২ রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না। যদি প্যাঙ্গোলিনকে ভাইরাসের বাহক ধরা হয় তাহলেও যুক্তি মিলবে না। কারণ প্যাঙ্গোলিনের শরীরে যে ভাইরাস পাওয়া গেছে তার রিসেপটর বাইন্ডিং ডোমেন (যে রিসেপটর প্রোটিনের মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের দেহকোষে ঢুকে পারে)-এর সঙ্গে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের কোনও মিল নেই। অগত্যা, মানতেই হবে পশুর শরীর থেকে এই মারণ ভাইরাস আসেনি। তাহলে এর উৎস কী?
উহানের পরিত্যক্ত খনিই রহস্যের আঁতুরঘর
রাহুল ও মোনালি দুই বিজ্ঞানীই ইউনান প্রদেশের মোজিয়াংয়ের পরিত্যক্ত খনির দিকে আঙুল তুলেছেন। চিনের ব্যাট ওম্যান শি ঝেংলি এবং তাইওয়ানের কিছু বিজ্ঞানীও একই কথা বলেছিলেন। গবেষক দম্পতি বলছেন, ২০০৪ সালে সার্স ভাইরাসের মহামারীর শেষ হওয়ার পর থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বেশ কিছু খনিকর্মী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই নিউমোনিয়ার উপসর্গ সাধারণ ছিল না। তাঁদের মধ্যে তিননের মৃত্যু হয়েছিল অজানা রোগে। সেই খবর পুরোপুরি চেপে গিয়েছিল চিন। রোগ ছড়াতে থাকলে খনিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।

পরে সেই খনিতে উহানের বায়োসেফটি ল্যাবের কয়েকজন বিজ্ঞানীকে আনাগোনা করতে দেখা যায়। বাদুড়ের মৃতদেহ, মলমূত্রের নমুনা খনি থেকে নিয়ে তাঁরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করছিলেন। ব্যাট ভাইরাস নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এমন দাবি করা হলেও আসলে সেই ব্যাট ভাইরাস ছিল
RaTG13। করোনার সঙ্গে এর ৯৬.২% মিল। এই ভাইরাল স্ট্রেনের জিনের অদলবদল করে তাকে মিউট্যান্ট করে তোলা হয়েছে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মগজাস্ত্র খাটিয়ে করোনার জন্মরহস্য খুঁজছে ভারতীয় গোয়েন্দা টিম ‘দ্য সিকার’, তথ্য জোগাচ্ছেন এই গবেষক দম্পতি
চিনের সার্স প্রজাতির ভাইরাস বিশেষজ্ঞ শি ঝেংলি বলেছিলেন, ২০১৫ সাল থেকেই উহানের বায়োসেফটি ল্যাবরেটরিতে করোনার মতো ভাইরাস নিয়ে কাজ হচ্ছিল। বাদুড় থেকে ছড়ানো ভাইরাসের উপর গবেষণা এবং বাদুড় অধ্যুষিত এলাকায় অনুসন্ধানের জন্য এই শি ঝেংলি ‘ব্যাট ওম্যান’ নামে পরিচিত। ভাইরাসের উৎস খুঁজতে তিনি নিজের বিশেষজ্ঞ দলও তৈরি করে ফেলেছেন, যার নাম DRASTIC—ডিসেন্ট্রালাইজড রেডিক্যাল অটোনোমাস সার্চ টিম ইনভেস্টিগেটিং কোভিড-১৯। এই টিমেরও দাবি, প্রকৃতিতে এই মারণ ভাইরাস জন্মায়নি, কৃত্রিমভাবে মিউট্যান্ট ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। ঝেংলির সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে দ্য সিকার (The Seeker)গ্রুপের।
[caption id="" align="aligncenter" width="1200"]
দ্য সিকার[/caption]
ভারতের কিছু বিজ্ঞানী, গবেষক, ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম তৈরি হয়েছে যার নাম ‘দ্য সিকার’ । এই টিমের কাজ সত্যান্বেষণ। ফেলুদা-ব্যোমকেশের মতোই মগজাস্ত্র খাটিয়ে করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করা। টুইটারে প্রথম এই টিমই এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পোস্ট করেছিল যা থেকে করোনার জন্মরহস্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছিল বিশ্ব। এই টিমকে নিজেদের গবেষণার রসদ জুগিয়েছিলেন ডক্টর রাহুল ও মোনালি।
গবেষক দম্পতি বলছেন, বাদুড় থেকে সংক্রামক ভাইরাস মানুষের শরীরে আসেনি। সম্ভবই নয়। চিন যে বাদুড় থেকে ভাইরাস ছড়াবার তত্ত্ব দিয়েছে তা এককথায় অসম্ভব। কারণ, যে হর্স শু (Horseshoe Bat)প্রজাতির বাদুড়কে করোনার জন্য দায়ী করা হয়েছে তাদের খোঁজ বেশি মেলে দক্ষিণ চিনের ইউনান ও গুয়াংডং প্রদেশে। উহান থেকে যা ১৫০০ থেকে ১৮০০ কিলোমিটার দূরে। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাদুড়রা উহানে এসে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে গেছে, এই তত্ত্ব পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাছাড়া মানুষের বসতির কাছাকাছি এই বাদুড়রা খুব একটা আসে না। কাজেই বাদুড়ের থেকে ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে গেছে সেটা বলা একেবারেই ঠিক হবে না। চিন আসলে এমন কিছু ভুয়ো তথ্য দিয়ে একটা মুখোশের আড়াল করে রাখছে।
ভাইরাস না রাসায়নিক মারণাস্ত্র?
বিজ্ঞানী হিসেবে রাসায়নিক মারণাস্ত্রের তত্ত্বে এখনই সিলমোহর দিতে রাজি নন গবেষক দম্পতি। তাঁরা বলেছেন, আগে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করাই উদ্দেশ্য, তারপর দেখা হবে সেটি মারণাস্ত্র ছিল কিনা। আরও কিছু খবর তাঁরা দিয়েছেন।
ড্রাস্টিক ও দ্য সিকার দুই টিমকেই এই তথ্যের কথা বলেছেন গবেষক দম্পতি। উহানে অন্তত ২৩টি ল্যাব আছে। উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি ছাড়াও উহান সিডিসিতেও গবেষণামূলক কাজ হয়। খবর মিলেছে, ইউনানের সেই পরিত্যক্ত খনি থেকে প্রায় ১৩ হাজার নমুনা উহানের গবেষণাগারগুলিতে গিয়েছিল। সেখানে ভাইরাস নিয়ে জোরদার গবেষণা চলছিল। কোনও অসতর্ক মুহূর্তে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
গবেষক দম্পতি বলছেন, চিন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষক টিম উহানের কাঁচা মাছ মাংসের বাজার থেকে ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে বারে বারেই দাবি করছে। কিন্তু সেটাও অসম্ভব। হু বলেছে, বাদুড় থেকে ভাইরাস কোনও ব্যক্তির মধ্যে এসেছিল, তাঁর থেকেই উহানের খোলা বাজারে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। তারপর এটা মহামারীর চেহারা নিয়েছে। ভারতীয় গবেষকরা বলছেন, এত সাধারণভাবে কোনও ভাইরাস ছড়ালে তা অতি মহামারীর পর্যায়ে যেতে পারে না। ভাইরাসকে মানুষের শরীরে ঢোকা ও মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেওয়ার কৌশল শিখতে হয়, যা সাধারণ ভাইরাস পারে না। সার্স-কভ-২ ভাইরাসের জিনের বিন্যাস বের করেই দেখা গেছে এই ভাইরাসকে প্রকৃতপক্ষে মানুষের শরীরে ঢোকার মতো করেই বানানো হয়েছে। এমন কিছু প্রোটিন আছে যা মানুষের দেহকোষের রিসেপটরকে চিনে নিতে পারে। দ্রুত জিনের বিন্যাস বদলে ফেলতেও পারে। এটা কৃত্রিম উপায় ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই ল্যাব-লিক থিওরিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলেই দাবি করেছেন তাঁরা।