
শেষ আপডেট: 9 July 2022 13:05
ঘৃণা, বিদ্বেষমূলক ভাষণ (Hate Speech) ঘিরে ক্রমবর্ধমান অশান্তির মুখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর আইনি পদক্ষেপ করার পথে এগোতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সরকার। সংসদের আসন্ন অধিবেশনে চলতি আইনের কিছু পরিবর্তন করা হবে বলে সরকারি সূত্রের খবর। সংসদের ওই অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (RJD) রাজ্যসভার সাংসদ মনোজ ঝাঁ একই বিষয়ে একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল আনতে চান। গতকাল তিনি রাজ্যসভার সচিবালয়ে এই ব্যাপারে নোটিস জমা করেছেন।
সরকারি সূত্রে খবর, ঘৃণা ভাষণ (Hate Speech) আটকানোর বিষয়ে সরকার বিরোধী দলগুলিকে পাশে নিয়েই এগোতে চায়। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে এই সংক্রান্ত প্রস্তাব পেশের পর তা নিয়ে তিক্ততা না বাড়িয়ে সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের স্থায়ী কমিটির কাছে সেটি পাঠিয়ে দিতে চায়। সেখানে সব দলের মতামতের ভিত্তিতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার পর তা সংসদের দুই কক্ষে পাশ করানো হবে।
কেন এই ভাবনা? প্রশাসনিক মহলের ব্যাখ্যা, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য, দেব-দেবী, ধর্মগুরুদের নিয়ে আপত্তিজনক কথার ফুলঝুরি ফুটছে দেশে। হরিদ্বার, দিল্লির ধর্মসংসদ থেকে হিন্দু সাধুদের মুখে মুসলিম হত্যার ফতোয়া নিয়ে থানা-পুলিশ-আইন-আদালত কম হয়নি। ধৃতদের কেউ কেউ জামিনের শর্ত লঙ্ঘন করে সংখ্যালঘুদের ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশের কোথাও না কোথাও ভোট লেগেই থাকে সারা বছর। আর ভোটের প্রচার হয়ে ওঠে ঘৃণা ভাষণের মহামঞ্চ। এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আইন কমিশন পাঁচ বছর আগে আইনমন্ত্রকের কাছে চলতি আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করলেও এতদিন ফাইল নড়েনি। কিন্তু নূপুর শর্মার মুখে ইসলামের নবীর অবমাননার (Prophet Debate) অভিযোগ ঘিরে আরব দূনিয়ার প্রতিক্রিয়া এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় অশান্তির ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার নড়েচডে় বসেছে। আদালত এবং আইন কমিশনের মতে চলতি আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা।
ঘৃণা ভাষণের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের বিষয়টি। তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিন্দুদের দেবী মা কালী সম্পর্কে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের বক্তব্য। একটি সিনেমার পোস্টার নিয়ে বিতর্কের জেরে মহুয়া বলেছেন, কালীর পুজোয় মদ ও মাংসের ব্যবহার হয়ে থাকে। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে তাঁর বিরুদ্ধে রে রে করে নেমে পড়েছে গেরুয়া শিবির। দেশের নানা প্রান্ত মিলিয়ে থানায় আনুমানিক ৬০টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে তাঁর নামে।
জাতীয় অপরাধ পঞ্জির সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা উদ্রেককারী ভাষণের ঘটনা গত সাত বছরে দেশে পাঁচশো শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-তে ১৮০৪টি অভিযোগ দায়ের হয় থানায়। কিন্তু মাত্র কুড়ি শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তের সাজা হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে এর প্রধান কারণ, চলতি আইনে ঘৃণা ভাষণের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তপক্ষ বাক-স্বাধীনতার কথা বলে পাল্টা যুক্তি পেশ করে।
আইন কমিশনের মতে, ভারতের মতো পশ্চাৎপদ অংশের মানুষ অনেক সময়ই ঘৃণা ভাষণের শিকার হয়েও সুবিচার পায় না। সংবিধানের ১৯ (২) নম্বর অনুচ্ছেদ বাক-স্বাধীনতার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। একই সঙ্গে বলা আছে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি ইত্যাদি বর্জন করে চলতে হবে।
এই বিষয়গুলি লঙ্ঘন আটকাকে বিভিন্ন আইনে রক্ষাকবচের ব্যবস্থা চলতি আইনে আছে। বস্তুত দেশে এই ব্যাপারে আইনের বলতে গেলে অভাব নেই। কিন্তু বিচার বিভাগের অনেকেই মনে করেন উপযুক্ত আইনের অভাব রয়েছে। আবার ভিন্ন মতও আছে কারও কারও। অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। যেমন, বিগত কয়েকটি নির্বাচনে প্রচারে ব্যক্তি আক্রমণ, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ভাষণ, প্রচারের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন হাত গুটিয়ে ছিল বলে কমিশনেরই প্রাক্তনীদের কেউ কেউ সরব হন। কমিশন আইনি সীমাবদ্ধতার দোহাই দিলে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি তা খণ্ডন করে পাল্টা বলেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেই এই ধরনের অপরাধে ব্যবস্থাগ্রহণে কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া আছে।
১. ১৮৬০ সালে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার সংজ্ঞা এবং সাজার বিধানের উল্লেখ আছে।
২. জাতি, ধর্ম, ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি আটকানোর বিধান রয়েছে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৫৩এ ধারায়। দেশের ঐক্য, সংহতি বিঘ্নের অভিযোগে মামলা হয় ১৫৩ বি ধারায়।
৩. কারও ধর্ম, ধর্ম বিশ্বাসকে সচেতনভাবে আঘাত করার ঘটনায় মামলা বিধান আছে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারায়। দণ্ডবিধির ২৯৮ এবং ৫০৫ ধারার (১) ও (২) উপধারাতেও আছে মামলা করার বিধান।
৪. এছাড়াও ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের আট নম্বর ধারায় ভোটের প্রচারে ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে বর্তমানে।
আর আছে,
ক. ১৯৫৫ সালের নাগরিক সুরক্ষা আইন
খ. ১৯৮৮ সালের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (অপব্যবহার প্রতিরোধ) আইন
গ. ১৯৯৫ সালের কেবল টিভি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ আইন
ঘ. ১৯৫২ সালের সিনেমাটোগ্রাফ আইন।
এই সব আইনেই ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনা বা সম্ভাবনা দেখা দিলে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। এছাড়াও রাজ্য সরকারগুলির হাতে আপত্তিজনক প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। আবার সময়ের দাবি মেনে চালু হয়েছে ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন।
কিন্তু আইন কমিশন মনে করছে আইনের গোড়ায় গলদ আছে। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকারের চালু করে ভারতীয় দণ্ডবিধিকে ঘৃণা ভাষণের বিপদকে যথেষ্ট স্পষ্ট করা হয়নি। পরবর্তীকালেও নানাবিধ সংশোধনীর সময় বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। তাই কমিশনের সুপারিশ মূল দণ্ডবিধিতেই ‘ঘৃণার প্ররোচনা দেওয়া’ এবং ‘ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে হিংসার প্রবণতা সৃষ্টি করা’-কে অপরাধ বলে চিহ্নিত করা দরকার। এখন দেখার নরেন্দ্র মোদী সরকার এই ব্যাপারে কতদূর অগ্রসর হয়।
দ্রৌপদীকে সমর্থনের প্রশ্নে যোগী-রাজ্যে ভাঙনের মুখে অখিলেশের ঘর